বাংলাদেশ-ভারত লড়াই ‘দ্বৈরথ নাকি রে-ষা-রে-ষি?’

ভিরাট কোহলি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ রুবেল হোসেন নাসির হোসেন ইমরুল কায়েস বাংলাদেশ-ভারত
Vinkmag ad

ক্রীড়া সাহিত্যের জনক নেভিল কার্ডাসের বিখ্যাত উক্তি, ‘পরিসংখ্যান আস্ত একটা গাধা’। আপনার জীবনের পরতে পরতে এই উক্তির পক্ষে যুক্তি মিলবে। ধরুন ‘বাংলাদেশ-ভারত’ ওয়ানডে ম্যাচ আগামীকাল, ঠিক এই মুহূর্তে আপনার ভাবনার জগতে নিশ্চিতভাবেই খেলা করছে চাপা উত্তেজনা, ভর করছে বাড়তি রোমাঞ্চ। বাংলাদেশ পারবেনা এমন ভাবনা একবারের জন্যেও হয়তো মাথায় আসছেনা, মন ঠিকই বলছে তামিম একটা দুর্দান্ত ইনিংস খেললে কিংবা লিটন ২০১৮ এশিয়া কাপের ফাইনালের মত ঝকঝকে একটা সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে দিলেই ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় লক্ষ্য ছুঁড়ে দেওয়া যাবে। বল হাতে বাকি কাজটা নাহয় মুস্তাফিজ, সাকিব, সাইফউদ্দিনরাই করলো।

অথচ পরিসংখ্যান বলবে পাল্লাটা ভারতের দিকে সয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকে যাওয়ার কথা। মুখোমুখি ৩৬ ওয়ানডেতে টাইগাররা জয়ের নিশান উড়িয়েছে মাত্র ৫ বার। সবশেষ জয়টিও আবার ৫ বছর আগে ঘরের মাঠে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে দু’দলের শরীরি ভাষা, মাঠে নেমে একে অপরকে গুড়িয়ে দেওয়ার তেষ্টা যে এক বিন্দুতে এসে মিশে গেছে! পরিসংখ্যানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের উন্নতির ছাপটা বেশ ভালোভাবেই রেখেছে সাকিব, তামিম, মুশফিকরা।

সবশেষ এক যুগে মাত্র তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি জিততে পেরেছে লাল-সবুজের জার্সিধারীরা। তবে জিততেই পারতো কিংবা জেতা উচিৎ ছিল এমন ম্যাচের সংখ্যা ছিল বেশকটিই। বিশেষ করে কিছু ম্যাচে হার তো বাংলাদেশি ক্রিকেট ভক্তদের হৃদয়ে র-ক্ত-ক্ষ-র-ণ করাবে বছরের পর বছর। এই জিততেই পারতো ম্যাচগুলোই আসলে বাংলাদেশ ভারতের ক্রিকেটীয় দূরত্বটা কমিয়েছে। প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজদের সেরাটা দিয়ে খেলতে হবে এই ভাবনা তৈরি করেছে ভারতীয় শিবিরে।

যার মধ্যে অন্যতম ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৩ বলে ১ রান প্রয়োজন এমন সমীকরণের ম্যাচ হার। মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর মত অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যান ক্রিজে থেকেও সেদিন তিন বলে তিন উইকেট হারায় বাংলাদেশ, ম্যাচের সাথে কোটি বাংলাদেশির রাতের ঘুমটাও কেড়ে নেন মাহেন্দ্র সিং ধোনি, হার্দিক পান্ডিয়ারা। ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে দীনেশ কার্তিকের রুদ্রমূর্তি ধারণ আরেক দফায় জ্বা-লি-য়ে পু-ড়ি-য়ে ছা-র-খা-র করে দেয় দেশের ক্রিকেট প্রেমীদের। শেষ ২ ওভারে ৩৪ প্রয়োজন এমন সময় ক্রিজে এসে ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময় পার্শ্বনায়কের ভূমিকায় পার করা দীনেশ কার্তিক আবির্ভুত হন নায়ক হিসাবে (ভারতের জন্য)।

Nidahas Trophy Final: Dinesh Karthik's last ball six helps India ...

রুবেল হোসেনের করা ১৯তম ওভার থেকেই আসে ২২ রান, পরের ওভারে মাত্র ১২ রান প্রয়োজন এমন ম্যাচও সৌম্য সরকার শেষ বল পর্যন্ত নিয়ে যান। প্রথম ৫ বলে ৭ রান দেওয়া সৌম্য শেষ বলে আর বাঁচাতে পারেননি ম্যাচ, মাত্র ৭ বলে ২৩ রান নিয়ে স্ট্রাইকে থাকা দীনশ কার্তিক যে সবটুকু আলো কেড়ে নিবেন বলে পণ করেছিলেন। রোমাঞ্চে মোড়ানো একটা ওভার বলতে যা বুঝায় সবই ছিল সৌম্যের করা ওভারটিতে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় একদমই ব্যাটে-বলে করতে না পারা বিজয় শঙ্কর ফিরেন পঞ্চম বলে উড়িয়ে মারতে গিয়ে। সাব্বির রহমানের হাত হয়ে বল তালুবন্দী করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ততক্ষণে প্রান্ত বদলে জয়ের নায়ক হওয়ার সব আয়োজন সেরে ফেলেন কার্তিক। শেষ বলে দরকার ৫, কিন্তু সেদিন দীনেশ কার্তিকের কাছে সব সম্ভব হয়ে ধরা দেয়, শেষ বলে ছক্কা হাঁকিয়ে আবারও ভূপাতিত করেন টাইগারদের। হতাশা সঙ্গী করে বাড়ি ফিরলো সাকিব আল হাসান এন্ড কোং।

দুই ম্যাচেই ভারতীয় ক্রিকেটার, দর্শকদের জয়ের উচ্ছ্বাসের চিত্র আপনার মস্তিস্কে একটা সহজ বার্তা দিবে। বাংলাদেশের সাথে জয় মানেই ‘এটাতো হওয়ারই ছিল’ ব্যাপারটা যে অতীত হয়ে গেছে- সেই বার্তা। হ্যাঁ, পরিসংখ্যান হয়তো এখনো বলবে বাংলাদেশ-ভারতের যোজন যোজন দূরত্বের কথা। আর এ জন্যই নেভিল কার্ডাসের ‘পরিসংখ্যান আস্ত একটা গাধা’ উক্তি চলে আসে সামনে। কারণ পরিসংখ্যান বোঝাতে অক্ষম বাংলাদেশের বিপক্ষে নামার আগে ভারতকে এখন সেরা একাদশই সাজাতে হয়, আঁটতে হয় ভিন্ন কৌশল।

ভারত-বাংলাদেশের মাঠের উত্তেজনা এই দুই ম্যাচ দিয়ে হয়তো পোক্ত হয়েছে। তবে পথটা তৈরি করেছে আরও কয়েকটি ম্যাচ। যে ম্যাচগুলোর লাগাম চাইলেই বাংলাদেশ টেনে ধরতে পারতো, ম্যাচের একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দুই দল লড়েছে সমানে সমানে। যার মধ্যে ২০১৮ এশিয়া কাপের ফাইনাল অন্যতম। লিটন দাসের দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে ২২২ রান করা বাংলাদেশ ম্যাচ হারে শেষ বলে, লক্ষ্য তাড়ায় ৭ উইকেট হারিয়ে একদম শেষ পর্যন্ত লড়তে হয় ভারতীয়দের। বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনার পেছনে এই ম্যাচে ঘটা এক বিতর্কিত কা-ন্ড-ও জড়িয়ে আছে।

বিতর্ক শব্দ যখন চলেই আসলো তবে পেছনে ফিরে যাওয়া যাক ২০১৫ বিশ্বকাপে। মেলবোর্নে ভারত-বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিই উপমহাদেশে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ-ভারতকে নিয়ে আসে সামনে। ফুটবলে যেমন পরিসংখ্যান যাই বলুক চিরকালই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ কেড়ে নেয় সব আকর্ষণ, উত্তেজনা। ভক্ত-সমর্থকরাও এই দুই দলের জন্য উজাড় করে দেয় নিজেদের, চায়ের কাপে ঝড় উঠে, কথার ল-ড়া-ইয়ে থাকে ঝাঁজ। কালের পরিক্রমায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একে ওপরের দিকে ছুঁড়ে দেয় চ্যালেঞ্জ, সমর্থনকারী দলের গুণগানে বাড়ায় প্রতিপক্ষের তেজ।

ঠিক তেমনি ক্রিকেটে এই লড়াইটা লম্বা সময় ধরেই ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে ঘিরেই দেখা যেত। ধর্ম, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংস্কৃতি বিবেচনায় একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে ২২ গজে নামাটা কেবল একটুকরো ব্যাট কিংবা একটা গোল বলের খেলা ছিলনা। ২২ জন ক্রিকেটার সবুজ গালিচায় নামতো আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজের পরেই বিশ্বজুড়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হত। উপমহাদেশেতো এই দ্বৈরথকে কখনো যু-দ্ধের চাইতে কম ভাবা হতনা। সময়ের চোরা স্রোতে একটা সময় এমন উপলক্ষ্য কমতে থাকে, যে রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক কারণে লড়াইটা জমে ক্ষীর হত সেই একই ইস্যুতে দু দেশের দ্বিপাক্ষিক সিরিজই নাই হতে শুরু করে।

দ্বিপাক্ষিক সিরিজে শেষদিকে একপেশে ভারতের শাসন, এরপর আইসিসি ইভেন্টেও আকাশি নীল জার্সিধারীদের একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্য দিয়ে পানসে হয়ে যায় প্রাণবন্ততা। মাঠের ক্রিকেটে ম্যাড়ম্যাড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুরোনো রেশ নেই বললেই চলে। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগে বাংলাদেশ-ভারত নতুন দ্বৈরথ তৈরিতে। কারণ ক্রিকেট পরাশক্তিতে পরিণত হওয়া ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস, সামর্থ্যটুক্য যে উপমহাদেশে এখন কেবলই টাইগারদের। লঙ্কানরা কিংবদন্তীদের বিদায়ে নতুন প্রভাতের আশায় দিন গুনছে, পাকিস্তানকে বলা হয় ‘আনপ্রেডিক্টেবল’, ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো এক পাগলাটে দল।

এমন ভিত্তিতে প্রথম ইটের গাঁথুনি হিসেবে আসে মেলবোর্নের সেই বিতর্কিত ম্যাচটি। যদিও ২০০৭ বিশ্বকাপে শচীন, সৌরভ, দ্রাবিড়দের নিয়ে গড়া ভারতকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেওয়া জয়েই শত কোটি ভারতীয়র হৃদয়ে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত সৃষ্টি করে সাকিব, তামিম, মুশফিকদের মত তরুণরা। এরপর মেঘে মেঘে কেটে যায় বেলা, পরের ৮ বছরে ১৩ দেখায় মাত্র এক জয় টাইগারদের। ততদিনে তরুণ সাকিব, মুশফিক, তামিমরা পরিণত দলের মূল স্তম্ভে। ইংলিশদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে ১৯ মার্চ কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি বাংলাদেশ-ভারত।

প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মাশরাফির বাংলাদেশ, টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা দলটা নিজেদের স্বপ্নের পরিধিটা আরেকটু বড় করে। সেমিতে যাওয়ার টিকিট কাটতে হারাতে হবে অন্যতম শক্তিশালী ভারতকে। টস হেরে আগে ব্যাট করা ভারতকে চাপেই রাখে টাইগার বোলাররা। ২৮ ওভার শেষে ১১৫ রানে নেই তিন উইকেট, ধাওয়ান, রাহানের সাথে ফিরে যান কোহলিও। এরপর ওপেনার রোহিত শর্মা ৫ নম্বরে নামা সুরেশ রায়ানাকে নিয়ে জুটি জমিয়েই ফেলেন, দুজনে মিলে যোগ করেন ৮৭ রান। না জুটিটা সেখানে থামেনি, থামার বড় একটা উপলক্ষ্য তৈরি হয় যা পরবর্তীতে দুই দেশের ক্রিকেট লড়াইয়ে অন্যতম বিতর্ক হিসেবেও ঠাই পায়।

Bangladesh players reacts to a no ball given by umpire Ian Gould during the quarte-final againsy India on Wednesday

রুবেল হোসেন ৪০ তম ওভারের চতুর্থ বলটি কোমর উচ্চতার ফুলটস ছোঁড়েন, কে জানতো ফুলটস নয় দুই দেশের ভক্ত সমর্থকেরতো বটেই ক্রিকেট রথী মহারথী, বিশ্লেষকদের তর্ক যু-দ্ধের বো-মাটিই ক্ষেপণ করলেন বাংলাদেশ পেসার। ৯০ রানে অপরাজিত রোহিতের ব্যাটে-বলে সংযোগটা ঠিকঠাক হয়নি। ডিপ মিড উইকেটে ইমরুলের হাতে ধরা পড়লেন ভারতীয় ওপেনার, প্রস্তুতিও নিচ্ছেন প্যাভিলিয়নে ফেরার। কিন্তু লেগ আম্পায়ার আলিম দার সংকেত দিলেন নো বলের, ফিল্ড আম্পায়ার ইয়ান গোল্ডও সায় দিলেন তাতে।

ধারাভাষ্যে থাকা শেন ওয়ার্ন তৎক্ষণাৎ অবাক বনে যান, বলে উঠেন, ‘এটা নো বল ছিল না। খুবই বাজে সিদ্ধান্ত।’ মাঠে টাইগার শিবিরের অবাক চাহনী, বাইরে দর্শকদের ক্ষোভ, ক্রিকেট বিশ্লেষকদের নানা মত। যার বেশিরভাগেরই মতামত বলটি ‘নো’ নয়, ছিল কেবল একটি ফুলটস। যাদের মধ্যে ছিলেন মাইকেল হোল্ডিং, অজিত আগারকার, শেন ওয়ার্ন, ভিভিএস লক্ষন, মার্টিন ক্রোর মত কিংবদন্তীরা। শেষ পর্যন্ত জীবন পাওয়া রোহিত পরের ২৪ বলে যোগ করেন ৪৬ রান, ভারত পায় ৩০২ রানের বড় পুঁজি। রোহিত শর্মার বিতর্কিত জীবন পাওয়াটাই টাইগার বোলারদের মানসিকভাবে এলোমেলো করে দেয়, ম্যাচের লাগাম আস্তে আস্তে সরে যায় দূরে।

‘নো’ বল বিতর্ক মাড়িয়ে সেমিফাইনালের স্বপ্নে বুঁদ হওয়া টাইগারদের তাড়া করতে হবে ৩০২ রানের পাহাড়, যেখানে মাঠের ১১ জনের সাথে প্রতিপক্ষ তেরঙ্গা হাতে ভারতীয় দর্শকে ভরা এমসিসির গ্যালারি। নাহ! সাকিব, তামিম, রিয়াদরা পেরে ওঠেনি, হেরেছে ১০৯ রানের বিশাল ব্যবধানে। অবশ্য ততক্ষণে ‘নো’ বল বিতর্কের সাথে যোগ হয়েছে আরও এক বিতর্ক। এবারও কাঠগড়ায় দুই আম্পায়ার। ৩৩ রানে দুই উইকেট হারানো বাংলাদেশকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা আগের দুই ম্যাচে ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরি হাঁকানো মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও সৌম্য সরকারের। মোহাম্মদ শামির করা ১৭ তম ওভারের শেষ বলে উড়িয়ে মারার চেষ্টা রিয়াদের।

বাধা হয়ে এলেন লং লেগ অঞ্চলে ফিল্ডিং করা শিখর ধাওয়ান যা পরবর্তীতে বহুল চর্চিত আলোচনার খোরাক হয়েছে। প্রথম দফায় বল উড়ে প্রায় বাউন্ডারি পার, তালুবন্দী করতে না পারলেও ছক্কা বাচিঁয়ে দ্বিতীয় চেষ্টায় ক্যাচে পরিণত করেন ভারতীয় ওপেনার। কিন্তু বল হাতে পৌছাতেই পায়ের নিয়ন্ত্রণ ঠিকঠাক করতে পারেননি, পা বাউন্ডারি দড়ি স্পর্শ করেছে কিনা এ নিয়ে ছিল সংশয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সন্দেহ জাগানো সিদ্ধান্তের জন্য তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে যাওয়ার কথা মাঠের আম্পায়ারদের। কিন্তু এত কিছুর তোয়াক্কা না করে আঙুল উঁচিয়ে ধরতে বেশিক্ষণ দেরি করেননি আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড। পরে টিভি রিপ্লে দেখে বেশিরভাগ ক্রিকেট বিশ্লেষক মত দিয়েছে নট আউটের পক্ষেই যা খালি চোখেও অনেকটা স্পষ্ট ছিল।

Top 4 controversial decisions of Cricket World Cup 2015-IndiaTV ...

বড় ব্যবধানে ম্যাচ হারায় পরিসংখ্যান হয়তো বলবেনা কতটা বিতর্কে মোড়ানো ছিল ম্যাচটি, যে ম্যাচে আম্পায়ারদের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন তখনকার আইসিসি সভাপতি আ.হ.ম মোস্তফা কামাল। বিসিবির সাবেক এই সভাপতিকে পরবর্তীতে বঞ্চিত করা হয় নিয়মানুসারে বিশ্বকাপ শিরোপা তুলে দেওয়ার অধিকার থেকেও। যে অভিমান আর ক্ষোভে পরে আইসিসি সভাপতির পদ থেকেই সরে দাঁড়ান মোস্তফা কামাল। তবে সব ছাপিয়ে মেলবোর্নের সেই কোয়ার্টার ফাইনাল বাংলাদেশিদের কাছে এখনো একটি অন্ধকার দিন হিসেবেই স্মৃতি হয়ে ফেরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাঁটা তারের এপার ওপার ফুঁসে একাকার। দুই দেশের ভক্ত-সমর্থকদের কাদা ছোড়াছুঁড়ি পৌঁছে যায় নোংরামি চূড়ান্ত সীমাতেও।

বিশ্বকাপের পর জুনে তিনটি ওয়ানডে ও একটি টেস্ট খেলতে বাংলাদেশ সফরে আসে ভারত। ভারতের আগেই বাংলাদেশ সফরে আসা পাকিস্তান অনেকটা নাকানি চুবানি খেয়েই সফর শেষ করে। পাকিস্তানের বিপক্ষে অমন দাপুটে পারফরম্যান্স আর বিশ্বকাপে মেলবোর্নে ঘটে যাওয়া কান্ডে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত টিম বাংলাদেশ ভারতকেও প্রথম দুই ওয়ানডেতে হারিয়ে সিরিজ জয় নিশ্চিত করে। পাকিস্তান সিরিজের একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে লিকলিকে এক তরুণ পেসার নজর কাড়ে বেশ ভালোভাবেই। পরবর্তীতে ভারবধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় সেই তরুণ পেসার মুস্তাফিজুর রহমান।

সিরিজের প্রথম ম্যাচে ওয়ানডে অভিষেক বাঁহাতি এই পেসারের, তার বিষাক্ত কাটারে হতভম্ব ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। সিরিজের প্রথম দুই ওয়ানডেতে বলতে গেলে একা হাতে জিতিয়েছেন বাংলাদেশকে, প্রথম ম্যাচে ৫ উইকেটের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেট, সিরিজ শেষ করেন ১৩ উইকেটে। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জেতে বাংলাদেশ, তবে বিতর্ক জড়িয়েছে ঐ সিরিজেও। সিরিজের প্রথম ম্যাচে টাইগারদের করা ৩০৭ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে বিনা উইকেটে ৯৫ থেকে ১১৫ রানেই চার উইকেট নেই ভারতের। দলের প্রয়োজনে লড়াইয়ের চেষ্টা মাহেন্দ্র সিং ধোনির, ইনিংসের ২৪ তম ওভারে রান নিতে গিয়ে ক্রিজে দাঁড়ানো বোলার মুস্তাফিজকে কনুই দিয়ে দেন ধাক্কা।

Did MS Dhoni Intentionally Push Bangladesh Bowler Mustafizur ...

ধোনির মত একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার কিনা অভিষিক্ত এক তরুণের সাথে ধাক্কাধাক্কিতে মজলেন। ব্যাপারটিকে ঠিক স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি বাংলাদেশের সমর্থকরা। ধোনির ধাক্কা খেয়ে কিছুক্ষণের জন্য মাঠও ছাড়তে হয় তরুণ এই পেসারকে। এরপর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি ধোনিও, সাকিব আল হাসানের বলে ক্যাচ দেন উইকেট রক্ষক মুশফিকুর রহিমকে। ধোনির উইকেট পেয়ে সাকিব আল হাসানের সেদিনের উদযাপন বাংলাদেশি ক্রিকেট ভক্তদের মনে থাকার কথা বহুদিন। যে উদযাপনে ছিল সতীর্থের ব্যথা উপশমের চেষ্টা।

তবে সিরিজ শেষে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়ে বসে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিক, মজার ছলেই নিজেদের সাপ্তাহিক এক ক্রোড়পত্রে একটি ছবি প্রকাশ করে যেখানে দেখা যায় একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ধোনি, কোহলি, রোহিত, অশ্বিন, জাদেজারা। তাদের মাথার অর্ধেক ন্যাড়া করা, সবার সামনে একটি ব্যানার যেখানে লেখা ‘আমরা ব্যবহার করেছি আপনিও করুন!’ তার উপরে দোকানের সাইনবোর্ডে মুস্তাফিজ দাঁড়িয়ে একটি কাটার হাতে। সাইনবোর্ডে লেখা এখানে বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত মুস্তাফিজ কাটার পাওয়া যায়। পুরো ব্যাপারটি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবেশি দেশ ভারতের সমর্থকরা আর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দোহাই মানতে নারাজ, একদম তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা বলতে যা বোঝায় তাই হয়েছে।

এশিয়া কাপের সবশেষ দুই আসরেই ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ। যা স্পষ্ট জানান দেয় এশিয়াতে ভারত-বাংলাদেশেরই আধিপত্য, ফলে মুখোমুখি লড়াইয়ে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে ভারত-বাংলাদেশের উন্মাদনা বাড়াতেও সাহায্য করে এটি। ২০১৬ এশিয়া কাপের ফাইনালের আগে ফটোশপে বানানো তাসকিনের হাতে ভারতীয় অধিনায়ক মাহেন্দ্র সিং ধোনির কাটা মুণ্ডুর একটি ছবিও ভারতীয় ভক্তকূলে ক্ষোভ জন্মাতে বাধ্য করে। যদিও এসব নেতিবাচক ব্যাপারকে উন্মাদনা না বলে রেষারেষি বলাটাই শ্রেয়, অন্তত দুই দেশের ক্রিকেট ভক্তদের আচরণে এমনটাই প্রকাশ পায়। অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রেষারেষি মাড়িয়ে ততদিনে মাঠের ক্রিকেটে ভারতীয়দের কাছে বাংলাদেশ বিবেচিত হতে শুরু করে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবেই।

বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও বিশ্বের যে প্রান্তেই দু দল একে অপরের মুখোমুখি হোক গ্যালারি যেন পূর্ণ হওয়া অবধারিত। প্রতিবেশি দেশ হয়েও টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার প্রায় দেড় যুগ পার হলেও বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে আমন্ত্রণ না জানানো ভারত ২০১৭ সালে সেটিও করে। তার আগে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ১ রানে হারা ম্যাচে আগেই জয় উদযাপন করা মুশফিক যোগ করেন আরও কিছুটা উপকরণ। নিজেরা আগে বিদায় নিলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায় স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজও। কিন্তু ওখানেও মুশফিক ঘটিয়ে বসেন আরেক বিতর্ক। বাসায় বসে ভারতের হার উদযাপন করার ছবি পোস্ট করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পেশাদার ক্রিকেটে কোন দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হয়ে অন্য আরেকটি দলের হার এভাবে প্রকাশ্যে উদযাপন আদতে বিতর্কিতই ছিল।

২০১৮ সালের এশিয়া কাপের ফাইনাল, লিটন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে ২২২ রানের পুঁজি নিয়েও বেশ লড়াই করে বাংলাদেশ। ৩ উইকেটের জয় পেতে ভারতকে খেলতে হয় শেষ বল পর্যন্ত। তবে জয়-পরাজয় ছাপিয়ে আরও একবার বাংলাদেশের বিপক্ষে যায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত। ভারতী বোলারদের শাসন করে ১১৭ বলে ১২১ রানের ইনিংস খেলা লিটন দাস শিকার হন স্টাম্পিংয়ের। কুলদীপ যাদবের বলে মাহেন্দ্র সিং ধোনিং স্টাম্পিং নিয়ে কম বিতর্কের জন্ম হয়নি। ঘটনা ৪১ তম ওভারের শেষ বলে, কুলদীপকে উড়িয়ে মারতে যান লিটন। ব্যাটে-বলে সংযোগ হয়নি, বল গ্লাভসে জড়াতেই দারুণ দক্ষতার সাথে স্টাম্প ভেঙে দেন ধোনি।

Mashrafe unsure about Liton dismissal | Dhaka Tribune

কিন্তু শুরুতে পা ঠিক জায়গায় না থাকলেও স্টাম্প ভাঙার আগেই জায়গায় পৌঁছে যায় লিটনের পা, তবে ঠিক স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলনা কি ঘটেছিল। লম্বা সময় ধরে রিপ্লে দেখে টিভি আম্পায়ার দিলেন লাল বাতি জ্বালিয়ে, মূলত লাল বাতি জ্বলে লিটনের নান্দনিক এক ইনিংসেরও। এমন অস্পষ্ট, দ্বিধা দ্বন্দ্ব থাকা সিদ্ধান্তে বেনেফিট অফ ডাউট বিবেচনায় ব্যাটসম্যানেরই জীবন পাওয়ার কথা। আম্পায়ারের এমন কান্ডে এবার ফুঁসে ওঠে এপার বাংলার ভক্ত-সমর্থকরা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্য আবারও উত্তাপ ছাড়াতে শুরু করে। যদিও বিতর্কিত ঐ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বেশিরভাগ ক্রিকেট বিশ্লেষকেরও ভোট পড়েছে নট আউটে। জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকেট এডিক্টর শিরোনাম করে, ‘MS Dhoni’s Controversial Stumping Ends Liton Das Heroic Ton In Asia Cup Final।’ ইএসপিএনের ধারাভাষ্যকার ভারতীয় সঞ্জয় মাঞ্জেরেকার বলেন, ‘যে সিদ্ধান্ত নিতে এত বার রিপ্লে দেখতে হয়েছে সেটি ব্যাটসম্যানের পক্ষে না যাওয়ায় কিছুটা বিস্মিত হয়েছি।’

এরপর এখনো পর্যন্ত দু দল ওয়ানডেতে মুখোমুখি হয়েছে মাত্র একবার। ২০১৯ বিশ্বকাপে বার্মিংহামের এজবাস্টনে ঐ ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে ২৮ রানে। সবশেষ গত নভেম্বরে ভারত সফরে প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে গেলেও ছিলনা ওয়ানডে। তিন ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথমটিতে জয়ও পায় টাইগাররা, জিততে পারতো তৃতীয় ম্যাচটিও। এই যে আবারও ‘জিততে পারতো’ এমন ম্যাচ যোগ হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত মুখোমুখি লড়াইয়ে। সাদা পোশাকে বরাবরই নাজুক বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে সিরিজের দুই ম্যাচেই। তবে রঙিন পোশাকে বাংলাদেশ যে কোহলি, রোহিত, ধাওয়ানদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে সেই উত্তাপ নিশ্চিতভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে মিরপুর থেকে মেলবোর্নে।

ViratKohliRubelHossainIndiavBangladeshjwMQwrdBDj2l

২০১৯ ইংল্যান্ড ও ওয়েলস বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে বাংলাদেশি সাংবাদিকরা ভারতীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে সাকিব, তামিমদের সম্পর্কে পেয়েছেন ভূয়সী প্রশংসা। ভারতীয় প্রভাবশালী কয়েকজন সাংবাদিক এটাও জানিয়েছেন যে পাকিস্তানের চাইতে বাংলাদেশের বিপক্ষে লড়াইটাই নাকি বেশি উপভোগ করছে ভারতীয় ক্রিকেটাররা। তবে এমন ইতিবাচকতার মাঝে আছে কিছু তিক্ততাও। যেমন এজবাস্টনে দুই দলের ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কাপ্তান মাশরাফিকে ক্রিকেটীয় আলোচনার পাশাপাশি দেশের ক্রিকেট ভক্তদের কাছে জানাতে হয়েছে অনুরোধও।

মাশরাফি বলেন, ‘দুই দলের লড়াইটা জমুক, বেশ উত্তেজনা ছড়াক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সীমা অতিক্রম না করে।’ এই একটা জায়গাতেই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দ্বৈরথ নাকি রেষারেষি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হবে তা নিয়ে তলে প্রশ্ন। এছাড়া এমন অনিয়মিত মুখোমুখি হওয়াটাকেও ক্রিকেটীয় দিক বিবেচনায় দ্বৈরথ হিসেবে তুলে ধরতে নিশ্চিতভাবে কিছুটা অনুৎসাহী করবে। উপমহাদেশে লড়াইটা জমে গেলে আখেরে লাভটা যে ক্রিকেটেরই, সেক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সিরিজের সংখ্যাটা যে বাড়াতেই হয়। নাহয় আরও একটি ক্রিকেট মহারণের ‘দ্বৈরথ’ হয়তো থেমে যাবে জমে ওঠার আগেই।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

‘অজিরা কেপটাউন কান্ডের আগেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল’

Read Next

টুইটারে রমিজ রাজা ও শোয়েব মালিকের কথার যুদ্ধ

Total
17
Share