একজন ‘স্বশিক্ষিত’ অফ স্পিনার অসাধারণ কিছু করে ফেলেছিলেন

জিম লেকার
Vinkmag ad

৩১ জুলাই ১৯৫৬, ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্রাফোর্ডে ঘড়িতে স্থানীয় সময় বিকেল ৫ টা ১৭ মিনিট। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যান লেন ম্যাডোককে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে ইংল্যান্ডের ইনিংস ও ১৭০ রানের জয় নিশ্চিত করলেন ইংলিশ অফ স্পিনার জিম লেকার। সতীর্থরা হাততালি আর করমর্দনে অভিনন্দন জানাতে ছুটছে, আম্পায়ারের কাছ থেকে সোয়েটার হাতে নিয়ে নীরবে হাঁটা ধরেছেন লেকার।

বাড়তি উচ্ছ্বাস,উদযাপনে অবশ্য মন নেই খানিক আগেই ক্রিকেট ইতিহাসের এক অন্যতম উচ্চতায় নিজের নামটি লিখিয়ে নেওয়া লেকারের। আসলে তখনকার ক্রিকেটে উইকেট, সেঞ্চুরি কিংবা বড় জয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার খুব একটা নজির ছিলনা। যেন এসব বড় বড় অর্জন কীর্তি স্বাভাবিক ঘটনা, এসব হওয়ারই ছিল।

অথচ দিনের শুরুতেও শঙ্কা হাতের মুঠোর ম্যাচটা বুঝি ড্র করে ফেলবে অস্ট্রেলিয়া। ফলো অনে পড়া অজিদের আশীর্বাদ হয়ে মাঝের দুদিন বৃষ্টি ঝরেছিল ম্যানচেস্টারের আকাশ থেকে। ঐ দুদিন খেলা হয়েছিল মাত্র ১০৭ মিনিট। কিন্তু এর আগেই অজি শিবিরে দাবানল ছড়িয়ে দেন জিম লেকার। টস জিতে ব্যাট করতে নামা ইংলিশরা পিটার রিচার্ডসন ও ডেভিড শেফার্ডের জোড়া সেঞ্চুরিতে দ্বিতীয় দিন দুপুর পর্যন্ত ব্যাটিং করে স্কোরবোর্ডে যোগ করে ৪৫৯ রান।

জিম লেকার
(Photo by Central Press/Getty Images)

জবাবে চা বিরতি আগে অজিরা তোলে ২ উইকেটে ৬২ রান। ওপেনার ম্যাক ডোনাল্ড (৩২) ও নেল হারভের (০) দুটি উইকেটই অফ স্পিনার লেকারে। আরেক ওপেনার জিম বার্ককে (২২) চা বিরতির পর প্রথম বলেই তুলে নেন ক্যারিয়ার জুড়ে জিম লেকারের সেরা বোলিং পার্টনার বাঁহাতি অর্থোডক্স টনি লক। কিন্তু এরপরই বিষের পেয়ালা নিয়ে হাজির জিম লেকার।

৩৭ মিনিটের ব্যবধানে লন্ডভন্ড অজি ব্যাটিং লাইন আপ। মাত্র ২২ বলে ৮ রান খরচে অজিদের শেষ ৭ উইকেট তুলে নেন এই অফ স্পিনার। অজিরা গুটিয়ে যায় ৮৪ রানে। লেকারের বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ১৬.৪-৪-৩৭-৯! তার আগে মাত্র তিনজন বোলারের ছিল টেস্টে এক ইনিংসে ৯ উইকেট নেওয়ার কীর্তি।

৯ উইকেট নেওয়া লেকার নিশ্চয়ই সতীর্থ বোলার টনি লকের উপর খানিক মন খারাপ করেছিলেন, টনি ঐ একটি উইকেট না নিলে যে ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রতিপক্ষের ১০ উইকেটই তার দখলে যেত। আর সেজন্যই হয়তো পরের ইনিংসে পণ করে নেমেছেন এবার আর কাউকে ভাগ দিবেন না উইকেটের, সবকটি উইকেট নিজের পকেটে পুরে লিখবেন ইতিহাস।

ফলো অনে পড়া অজিরা দ্বিতীয় দিন শেষ করে ১ উইকেটে ৫৩ রানে। ঐ একটি উইকেটও লেকারের দখলে। পরদিন ২৮ জুলাই বিশ্রামের দিন, বৃষ্টি বাঁধায় ২৯ জুলাই খেলা হল ৪৭ মিনিট, ৩০ জুলাই ১ ঘন্টা। এই সময়ের মধ্যে অজিরা লেকারকে দেয় আরও এক উইকেট। জিম বার্কেকে ফেরান ৩৩ রানে।

৩১ জুলাই শেষদিন খেলা শুরু হল ১০ মিনিট দেরিতে, সকাল থেকে ম্যানচেস্টারের আকাশে মেঘেদের উড়াউড়ি, অজিদের মনে আশার সঞ্চার। ম্যাচ বাঁচাতে খেলতে হবে পুরোদিন, হাতে উইকেট ৮ টি। অপরাজিত আছেন কলিন ম্যাকডোনাল্ড ও ইয়ান ক্রেইগ। কিন্তু সময় গড়াতেই ঝকঝকে সোনালী রোদ ওল্ড ট্রাফোর্ডে। এরপরও ২ উইকেটে ৫৯ রানে দিনশুরু করা অজিদের স্বপ্নটা বড় করে কলিন ম্যাকডোনাল্ড, ক্রেইগকে (৩৮) নিয়ে যোগ করেন ৫৫ রান, অবিচ্ছিন্ন জুটিতে লাঞ্চের আগ পর্যন্ত।

ম্যাচ বাঁচানোর পথে আলোর দেখা অজিদের, হাতে ৮ উইকেট নিয়ে চার ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া অসম্ভব নয়। এদিকে পিচে স্পিন ধরতে শুরু করেছে, জিম লেকারও নিজেকে হয়তো তাতিয়ে তুলছেন বিষাক্ত ছোবলে অজি শিবিরে হাহাকার বাড়াতে। লাঞ্চের পর লেকার তুলে নেন ৯ ওভারে তিন রান খরচে ৪ উইকেট। অজিদের ড্রয়ের স্বপ্নে যেন জল ঢেলে দিলেন। এক প্রান্ত আগলে রাখা ম্যাক ডোনাল্ডকে সঙ্গ দিতে যোগ দেন পরবর্তীতে বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার হিসেবে আবির্ভাব হওয়া রিচি বেনো। দুজনে চা বিরতির আগে ৭৫ মিনিট কাটান নির্বিঘ্নে।

কিন্তু চা বিরতির পর খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি ইংলিশদের, অবশ্য ইংলিশদের না বলে জিম লেকারের বললেই এ ক্ষেত্রে যথার্থ হয়। কারণ অস্ট্রেলিয়ার সবকটি উইকেটই যে তার শিকার। ৩৩৭ মিনিট ক্রিজে থাকা ম্যাক ডোনাল্ড ফিরে যান ৮৯ রানের লড়াকু এক ইনিংস খেলে। বোল্ড হওয়ার আগে ১৮ রানের বেশি করতে পারেননি রিচি বেনোও। দিনের খেলা শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময়ের ১ ঘন্টা আগেই ২০৫ রানে অল আউট অস্ট্রেলিয়া।

ইংল্যান্ড নিশ্চিত করে ইনিংস ও ১৭০ রানের জয়। জিম লেকারের বোলিং ফিগার ৫১.২-২৩-৫৩-১০। প্রথমবার ক্রিকেট ইতিহাসে এক ইনিংসে প্রতিপক্ষের সবকটি উইকেট শিকারি বোলার বনে যান জিম লেকার। ম্যাচে তার বোলিং ফিগার ৬৮-২৭-৯০-১৯! টেস্টতো বটেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও এমন নজির নেই অন্য কারও। টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচে তার আগে সেরা বোলিং ফিগার ছিল স্বদেশী সিডনি বার্নসের (৬৫.৩-১৬-১৫৯-১৭ প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯১৩ সালে)।

জিম লেকার
(Photo by Hulton Archive/Getty Images)

সেদিন পড়ন্ত বিকেলে জিম লেকার ওল্ড ট্রাফোর্ডে যে রেকর্ড গড়লেন তা ইতিহাসে আজ অব্দি অক্ষুন্নই আছে। ইনিংসে প্রতিপক্ষের সবকটি উইকেট নেওয়ার নজির টেস্ট ক্রিকেট দেখেছে আরও একবার, প্রায় ৪৩ বছর পর ১৯৯৯ সালে ভারতীয় লেগ স্পিনার আনিল কুম্বলে দিল্লীর ফিরোজ শাহ কোটলায় পাকিস্তানের বিপক্ষে গড়েন এই কীর্তি। কিন্তু জিম লেকারের ম্যাচে ১৯ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডকে এখনো ভাবা হয় ক্রিকেট অসাধ্যগুলোর একটি।

বলা হয়ে থাকে ক্রিকেট সব সম্ভবের খেলা, প্রতিনিয়ত হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ড। রেকর্ড ভাঙছে, রেকর্ড গড়ছে, তবে জিম লেকার এসব দেখে উপর থেকে হয়তো মুচকি হাসছেন। স্পিন ঘূর্ণিতে প্রায় ৭০ বছর আগে যে রেকর্ড গড়েছেন তার সবচেয়ে কাছে যাওয়া ভারতীয় লেগ স্পিনার নরেন্দ্র হিরওয়ানি ১৯৮৮ সালে নিয়েছেন ম্যাচে ১৬ উইকেট যা লেকারের থেকে তিন উইকেট কম। তারও আগে ১৯৭২ সালে অজি পেসার বব ম্যাসিও ১৬ টির বেশি শিকার করতে পারেননি।

জিম লেকার আদৌতেই এমন এক কীর্তি গড়েছেন যা কারও কল্পনার জগতকেও হার মানাতে পারে। তাইতো বিখ্যাত ধারাভাষ্যকার ও টিভি সঞ্চালক ডোন মোসেই লেকারকে নিয়ে লেখা ‘লেকারঃ পোর্ট্রেট অব অ্যা লিজেন্ড’ বইতে লিখেছেন, ‘কারোই কল্পনা করা সম্ভব না (জিম লেকার যা করেছে), তার কল্পনাশক্তি যত উর্বর হোক না কেন, তার আত্মবিশ্বাস যতই তুঙ্গে থাকুক, সর্বোচ্চ বাস্তবতার দ্বিগুণ হওয়া সম্ভব। আর সেটি জিম লেকার করে দেখিয়েছে।’

জীবন কখনো কখনো সিনেমাকেও হার মানায়, জিম লেকার হতে পারেন তার বড় উদাহরণ। নাহয় সেনাবাহিনীতে যোগদান করা জিম লেকার কেনই বা ব্যাংকের চাকরিতে ফিরতে চাইবেন আর শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গড়তে ক্রিকেটকেই বেছে নিবেন? দলে আসা যাওয়ার মিছিলে থেকে বিরক্তিতে এক সময় নিউজিল্যান্ড পাড়ি জমিয়ে কেনইবা মাস পাঁচেক পর ফিরে আসবেন ইংল্যান্ডে?

১৯২২ সালে ইয়র্কশায়ারের ব্র্যাকফোর্ডে জন্ম সাবেক এই ইংলিশ অফ স্পিনারের। দুই বছর বয়সেই বাবাকে হারান লেকার, এমনটাই জানতো সবাই। যদিও পরবর্তীতে জানা যায় মারা যাননি বরং তাকে ও তার মাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন তার বাবা চার্লস লেকার। তার কৈশোরে পদার্পনের সময়টায় মা তৃতীয়বারের মত সঙ্গী বদলালে ১৯৪১ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদানের আগ পর্যন্ত তাদের সাথেই থাকেন এই ইংলিশ কিংবদন্তী।

তার আগে ১৯৩৯ সালে স্কুল জীবনের ইতি টেনে ব্র্যাডফোর্ড সিটি সেন্টারে বার্কলেস ব্যাংকে ৫ ইউরোর বিনিময়ে দৈনিক ৯ ঘন্টার চাকরি নেন জিম লেকার। পরে বয়স লুকিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যোগ দেন সেনাবাহীনিতে, মধ্যপ্রাচ্যে পোস্টিং পড়া লেকার সরাসরি যুদ্ধ না করলেও দিন পার করেছেন পেলেস্তাইন, কায়রোতে।

ততদিনে তার ক্রিকেট প্রতিভা বিকশিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত সময় ও ভালো মানের কোচের অভাবে নিজেই অফ স্পিনটা আয়ত্ব করেছেন উল্লেখ করে জিম লেকার একবার বলেছেন, ‘আমি স্পিঙ্কস এবং পিরামিডের ছায়ায় একজন স্ব-শিক্ষিত অফ স্পিন বোলার হয়েছি কারণ আমাকে সাহায্য করার মত কোন কোচ বা শেখার জন্য অন্য উপায়ও ছিলনা।’ নিজের ক্রিকেট সার্কেলে ব্যাটসম্যান ও মিডিয়াম ফাস্ট বোলার হিসেবে পরিচিত পাওয়া লেকার কাউন্টি ব্যাটসম্যান বেনি উইলসনের পরামর্শে অফ স্পিন শুরু করেন।

জিম লেকার
Photo Credit: Adrian Murrell/Allsport

যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরা লেকার তখনো পেশাদার ক্রিকেটে ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপারে ছিলেন না নিশ্চিত। আরও ৬ মাস কাজ করেন, পোস্টিং হয় ক্যাটফোর্ডে। বলা হয়ে থাকে এটিই তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরুর সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। ক্যাটফোর্ড সিসির সভাপতি ছিলেন অ্যান্ড্রু কেম্পটন যিনি কাউন্টি দল সারের সম্মানজনক সদস্য ছিলেন। লেকারকে তিনিই কেনিংটন ওভাল কর্মকর্তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। স্কুল ক্রিকেটের নিয়মিত সদস্য লেকার ব্যাট করতেন ৪ নম্বরে, আছে একটি সেঞ্চুরিও। পরবর্তীতে খেলেছেন স্থানীয় সল্টলেয়ার ক্লাবের হয়ে ব্র্যাডফোর্ড লিগও।

একটা ট্রায়ালের পর সারে লেকারকে পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে তাদের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার জন্য নিজেকে ঠিক প্রস্তুত মনে হয়নি লেকারের। তার পুরোনো কর্মস্থল বার্কলেস ব্যাংকে অনুরোধ করেন তাকে যেন লন্ডনে বদলি করে আবারও চাকরিতে নেওয়া হয়। প্রস্তাবে রাজি হয় বার্কলেস ব্যাংক কিন্তু মাস ছয়েক পর সব ছেড়েছুড়ে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অফ স্পিনার নাম লেখান সারেতে।

নাটকীয়ভাবে পেশাদার ক্রিকেটে ঢুকে পড়লেন জিম লেকার, ১৯৪৭ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে অভিষেক। ঐ মৌসুমে ৭৯ উইকেট নিয়ে নজর কাড়েন দারুণভাবে, পরের বছরই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ডাক পান ইংল্যান্ড দলে। মূলত সংগ্রামের শুরুটাও এরপর থেকেই। অভিষেক টেস্টে কিংস্টন ওভালে প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেট নিয়ে নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন বেশ ভালোভাবেই।

কার্যত ক্যারিয়ারের শুরুতে সুখের স্মৃতি অতটুকুই। সিরিজে পরের তিন টেস্টে দলের সাথে ব্যর্থ জিম লেকারও। অফ স্পিন ভেল্কিতে ঠিক অভিষেক ম্যাচের দাপট ধরে রাখতে পারেননি। ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়া লেকার দ্বিতীয় ৫ উইকেট শিকারে খেলেছেন ৯ টেস্ট। ততদিনে সময় পেরিয়েছে তিন বছর। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মুড়ি মুড়কির মত উইকেট তুলে নেওয়া লেকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন কর‍তে পারছেন না। দলেও আসা যাওয়ার মিছিল শুরু। বিশেষ করে অফ স্পিনারের চাইতে বাঁহাতি অর্থোডক্স ও লেগ স্পিনার খেলাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য টিম ম্যানেজমেন্টের।

ওল্ড ট্রাফোর্ডে রেকর্ড গড়া ম্যাচের আগ পর্যন্ত দলে জায়গা পাকা ছিলনা এই অফ স্পিনারের। পুরোটা সময় স্কোয়াড, একাদশে জায়গা পেতে লড়াই করতে হয়েছে বাঁহাতি অর্থোডক্স জ্যাক ইয়ং, লেগ স্পিনার রলি জেনকিনস এবং ডগ রাইটের সাথে। পরবর্তীতে লেগ স্পিনার এরিক হোলিসের সাথে তার দলে জায়গা পাওয়াটা ছিল কেবলই কৌশলগত নির্বাচন, একাদশে ঠিকই খেলানো হত হোলিসকে।

শেষদিকে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়ে বাঁহাতি অর্থোডক্স জনি ওয়ার্ডলে ও আরেক অফ স্পিনার রয় ট্যাটারসাল। এমনও হয়েছে কোন সিরিজের ৫ ম্যাচেই ট্যাটারসাল খেলেছেন যেখানে প্রায় ম্যাচেই একাদশের বাইরে থাকতে হয়েছে জিম লেকারকে। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বব অ্যাপ্লিয়ার্ড এমনকি ব্রায়ান ক্লোজের সাথেও যুদ্ধ করতে হয়েছে।

জাতীয় দলে জায়গা পেতে সংগ্রাম চললেও প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে নিজের অবস্থান করে ফেলেছেন বেশ শক্ত। ১৯৫১-৫২ মৌসুমে ব্যাগপত্র গুছিয়ে স্ত্রীসহ পাড়ি জমান নিউজিল্যান্ডে। অকল্যান্ডের কোচ ও খেলোয়াড় হিসেবে নাম লেখান জিম লেকার, অকল্যান্ডের হয়ে ৪ ম্যাচ খেলে নেন ২৪ উইকেট। ৫ মাস অবস্থান শেষে সিদ্ধান্ত বদলে আবারও ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। হয়তো তাকে দিয়ে ইতিহাস রচনা করাবেন বলে ক্রিকেট বিধাতাই আবারও টেনে এনেছেন।

ফিরে এসেও খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। আসা যাওয়ার মধ্যেই কাটছিল তার টেস্ট ক্যারিয়ার। তার অভিষেকের পর দল ৯৯ টেস্ট খেললেও নিজের জায়গা হয়েছে মাত্র ৪৬ টিতে। ১৯৫৬ সালের ঐতিহাসিক অ্যাশেজ সিরিজের আগেতো সাড়ে ৮ বছরের ক্যারিয়ারে খেলতে পেরেছেন মাত্র ২৬ টেস্ট! সেবার অ্যাশেজে শেষে দলে স্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি রেকর্ড বইয়ের কয়েক জায়গাতে নিজের নামটা টুকিয়ে নেন , ক্রিকেট ইতিহাসে পরিচয় করান অনেক প্রথমের।

সিরিজের চতুর্থ ম্যাচে ওল্ড ট্রাফোর্ডে এক ম্যাচে ১৯ উইকেট ও ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়ার আগের তিন ম্যাচেও নেন ২০ উইকেট। শেষ ও পঞ্চম টেস্টে ৭ উইকেট নিলে সিরিজ শেষে লেকারের নামের পাশে জ্বলজ্বল করে ৪৬ উইকেট। এরপর এখনো অব্দি আর কোন ইংলিশ বোলার ৫ ম্যাচ টেস্ট সিরিজে নিতে পারেনি এত উইকেট।

যদিও লেকারের চাইতেও বেশি উইকেট আছে একজনের। টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে সমাদৃত ইংলিশ মিডিয়াম পেস কাম লেগ স্পিনার সিডনি বার্নস ১৯১৩-১৪ মৌসুমে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নেন ৪৯ উইকেট।

ম্যাচে ৯০ রানে ১৯ উইকেট এখনো টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচে সেরা বোলিং ফিগার হিসেবে টিকে আছে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে কটি রেকর্ড ক্রিকেট ইতিহাসে টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রবল সেগুলোর শীর্ষে অবধারিতভাবেই থাকবে জিম লেকারের এই অনন্য কীর্তি।

ঐ ম্যাচে লেকার আরও একটি প্রথমের সাথে পরিচয় করান ক্রিকেট ভক্তদের। ম্যাচে প্রতিপক্ষের ১১ জন ব্যাটসম্যানকেই আউট করা প্রথম বোলার তিনি, পরে অবশ্য আরও দুজন এই রেকর্ডে ভাগ বসান। ১৯৬৫ সালে দিল্লীতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতীয় অফস্পিনার শ্রীনিবাসরাঘবন ভেঙ্কটরাঘবন ও ১৯৭৯ সালে ভারতের বিপক্ষে অজি মিডিয়াম পেসার জিওফ ডাইমক এই কীর্তিতে নাম লেখান।

বাম থেকে পিটার লোডার, রন টিন্ড্যাল, জিম লেকার, টনি লক ও কেন বেরিংটন
বাম থেকে পিটার লোডার, রন টিন্ড্যাল, জিম লেকার, টনি লক ও কেন বেরিংটন (Photo by Patrick Eagar/Popperfoto/Getty Images)

ইনিংসে ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি আরও একবার দেখিয়েছেন ইংলিশ স্পিন জাদুকর। ইতিহাস গড়া ১৯৫৬ অ্যাশেজ সিরিজের আগেই সারের হয়ে অস্ট্রেলিয়ানসদের বিপক্ষে ৮৮ রানে তুলে নেন সবকটি উইকেট। ১৯৫০ সালে ব্রাদারফোর্ডে টেস্ট ট্রায়ালে ১৪ ওভার বল করে ১২ মেডেনসহ ২ রানে ৮ উইকেট পকেটে পুরেও বেশ হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন।

বলের প্রতি তার নিয়ন্ত্রণটা ছিল দুর্দান্ত, বল করার সময় লেগ স্লিপে দুজন, শর্ট স্কয়ার লেগ, মিড অন, স্কয়ার লেগ এবং মাঝে মাঝে বাউন্ডারির কাছাকাছি ডিপ মিড উইকেটেও রাখতেন ফিল্ডার। তার বোলিং নিয়ন্ত্রণের কথা জানাতে গিয়ে সাবেক ইংলিশ ব্যাটসম্যান মিকি স্ট্রুয়াট বলেন, ‘জিমের (জিম লেকার) অন্যতম বড় সম্পদ ছিল যেকোন পরিস্থিতেই বলের উপর নিয়ন্ত্রণ খাটাতে পারা।’

১৯৫৯ সালে মেলবোর্নে টেস্ট ক্রিকেটের ইতি টানা জিম লেকার ক্যারিয়ার শেষ করেন ৪৬ টেস্টে ২১.২৪ গড়ে ১৯৩ উইকেট নিয়ে, ইনিংসে ৫ উইকেট ৯ বার, ম্যাচে ১০ উইকেট শিকারের কীর্তি তিনবার। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলেন ১৯৬৪-৬৫ মৌসুম পর্যন্ত। ৪৫০ প্রথম শ্রেণির ম্যাচে ১৮.৪১ গড়ে উইকেট নিয়েছেন ১৯৪৪ টি, ইনিংসে ৫ বা তার বেশি উইকেট ১২৭ বার, ম্যাচে ১০ উইকেট ৩২ বার।

এত বড় লম্বা ক্যারিয়ারে ২০ এর নিচে গড়ে বোলিং নিশ্চিতভাবেই বিশেষ কিছু। প্রথম শ্রেণিতে ব্যাট হাতে ১৮ ফিফটির সাথে ২ সেঞ্চুরি বোঝাতে সক্ষম লেজের দিকে দলের প্রয়োজনে কার্যকর একজন ছিলেন জিম লেকার। ফিল্ডিংয়েও লেকারের সমান বিচরণ, গালি পজিশনে তাকে বলা হত সময়ের সেরা। লেকারকে বিশেষায়িত করতে গিয়ে ‘প্লেফেয়ার’ যেমন লিখেছে, ‘একজন বিশেষজ্ঞ স্পিনার, ব্যাট হাতে আস্থাভাজন ও গালিতে দুর্দান্ত এক ফিল্ডার।’

নানা অর্জনের ভীড়ে ১৯৫৬ সালে বিবিসি বর্ষসেরা ক্রীড়া ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া বিশেষ কিছুই। কারণ প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে বিবিসির এই পুরষ্কার জিতেছেন জিম লেকার। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে বিবিসির ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার হিসেবেও কাজ করেন এই কিংবদন্তী। ১৯৫৬ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্ট তার নামানুসারে ‘লেকার্স ম্যাচ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৮৬ সালের ২৩ এপ্রিল ৬৪ বছর বয়সে বিবিসিতে কর্মরত অবস্থাতেই পিত্তথলি সার্জারিতে পরলকগমন করেন ক্রিকেট ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের রচয়িতা। পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও ক্রিকেট যতদিন টিকে থাকবে জিম লেকারকেও মনে রাখতে হবে নিশ্চিতভাবে ততদিনই।

ছোট্ট একটি মজার তথ্য দিয়ে ইতি টানা যাক জিম লেকারের মত কীর্তিমানের জীবনগাঁথার। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যাচে ১৯ উইকেট শিকারের কীর্তির পর তার স্ত্রী লিলি লেকারের কাছে অসংখ্য শুভেচ্ছা বার্তা আসে। ক্রিকেট খুব একটা বুঝতেন না অস্ট্রিয়ার এই নারী। সেনাবাহিনীর চাকরির সুবাদে দুজনের পরিচয়, প্রণয় হয়ে শেষে জীবনসঙ্গী। তো অনন্য এই কীর্তি শেষে লেকার বাসায় ফিরলেই স্ত্রী প্রশ্ন করে বসেন, ‘জিম, আপনি কি আজ অসাধারণ কিছু করে ফেলেছেন?’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

শেষ হলো নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ, কি করবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া?

Read Next

বিশ্বকাপজয়ী পেসার এবার করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে

Total
18
Share