একজন মতি স্যার, মুশফিকের বিপদের বন্ধু

মুশফিকুর রহিম মতিউর রহমান মতি বিকেএসপি
Vinkmag ad

রামাকান্ত আচরেকার, শচীন টেন্ডুলকার নামক ক্রিকেট দেবতার স্রষ্টা। শচীন ক্যারিয়ারের শেষদিকেও ব্যাটিংয়ে উন্নতির জায়গা নিয়ে ছুটে যেতেন শৈশব কোচ রামাকান্তের কাছে। গতবছর পরলোকগমন করা মুম্বাইয়ের এই কোচ কতটা জড়িয়ে ছিলেন শচীনের ক্রিকেট, ব্যক্তিগত জীবনে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ভারতের ব্যাটিং ঈশ্বর একটু পেছনেরই হয়ে যায়, ভারতের বর্তমান অধিনায়ক, সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ভিরাট কোহলির কথাই ধরা যাক।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা খারাপ ফর্ম গেলেও নিজেকে আগেই নিয়ে গেছেন অন্য চূড়ায়। নিজের ঘোর শত্রুকেও নান্দনিক ব্যাটিং দিয়ে ভক্ত বানানোর ক্ষমতা রাখা এই ব্যাটসম্যান এখনো ব্যাটিং উন্নতির জায়গা নিয়ে কথা বলেন শৈশবের কোচ রাজকুমার শর্মার সাথে। দিন দুয়েক আগেও কোহলির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাজকুমার ভারতীয় এক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা এখনো ক্রিকেট ও তার (কোহলি) খেলা নিয়ে কথা বলি। আমাদের কথা হয় কোথায় সে ভালো করছে আর কোথায় এখনো উন্নতির সুযোগ আছে।’

শৈশবেএ কোচরা কতটা গুরুত্বপূর্ন একজন ক্রিকেটারের জন্য সেটা বোঝাতেই শচীন-কোহলি প্রসঙ্গ টেনে আনা। শচীন, কোহলিরা নাহয় ভীনদেশি, বাংলাদেশের পোস্টারবয় সাকিব আল হাসান যখনই মনে করেন তার কিছু ঠিকঠাক হচ্ছেনা, ধন্যা দেন কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কাছে। আইপিএল চলাকালীন জরুরী ভিত্তিতে কোচের সাথে দেখা করে পরামর্শ নিতে সাকিবের দেশে ফিরে আসার ঘটনা এখনো খুব বেশি পুরোনো হয়নি। সাকিব, তামিম, মুশফিকদের দুঃসময়ে কিছু নির্দিষ্ট নাম খুব বেশি শোনা যায় তারা হলেন নাজমুল আবেদিন ফাহিম, মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, বিকেএসপির মতিউর রহমান (মতি)।

মুশফিকুর রহিমের খারাপ সময়, সেটা হোক ব্যাটিং কিংবা তার বাইরের কিছু নির্দ্বিধায় চলে যান মতিউর রহমানের কাছে। বিকেএসপির এই ক্রিকেট কোচের হাতেই শুরুর ক্রিকেট দীক্ষা মুশফিক-সাকিবদের। তবে মুশফিকের যেন কোচের চাইতেও বাড়তি কিছু। ২০১৮ সালে এক সাক্ষাৎকারে মুশফিক জানান, ‘কোথাও আটকে গেলে নাজমুল আবেদীন ফাহিম স্যার, সালাউদ্দিন স্যার কিংবা আমার বিকেএসপির কোচ মতি স্যারের কাছ থেকে পরামর্শ নিই।’

শুধু ঐ সাক্ষাৎকার নয় বিভিন্ন সময়ে মুশফিক মতিউর রহমানকে উপস্থাপন করেছেন অবিভাবক হিসেবেই। গতকাল (১৩ মার্চ) বিকেএসপিতে হয়ে যায় মুশফিকদের ২০০০ সালের ব্যাচের পূনর্মিলনী। বিভিন্ন ক্রীড়া বিভাগের শতাধিক ক্যাডেটের উপস্থিতিতে মুশফিকরা দিনটা করে নেন নিজেদের। তারা সম্মাননা জানায় তাদের সেই সময়কার শিক্ষক-কোচদের। ক্রিকেট কোচ মতি প্রসঙ্গ আসতেই অনুষ্ঠান সঞ্চালক মুশফিকদের বাংলা শিক্ষক শামীমুজ্জামান সামনে আনেন দুজনের অতীত-বর্তমান সম্পর্ক।

৬ বছর বিকেএসপিতে কাটানো মুশফিক নিজ গুণে মুগ্ধ করেছেন শিক্ষক-কোচদের। ক্রিকেট দীক্ষা নেওয়া মতি এখনো মুশফিকের মনে অনেক বড় জায়গাজুড়ে আছেন। টেকনিক্যালি দেশের অন্যতম সেরা ও ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান ব্যাটিং নিয়ে সমস্যা পড়লেই মতির সান্নিধ্য নেন। কোচ হিসেবে যার এত গুণগান, মুশফিকের মত ব্যাটসম্যানের বিপদের বন্ধু তাকে কাছে পেয়ে মুশফিক প্রসঙ্গে বাড়তি কিছু জানার আগ্রহ থেকেই পূনর্মিলনীর বিরতিতে কথা বলা। নামাজের সময় বলে খুব বেশি সময় দিতে না পারলেও যতক্ষন কথা বলেছেন অতীতের মুশফিকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন দারুণভাবে।

বিকেএসপিতে ভর্তির হওয়ার পরই মুশফিকের মধ্যে ভবিষ্যত তারকা খুঁজে পান এই কোচ, ‘ছোট থেকেই বোঝা যেত সে প্রচন্ড মেধাবী। তার কাজের লক্ষণ দেখেই বোঝা যেত ভবিষ্যতে বড় কিছু একটা হবে, দেখেই বোঝা যেত। ওকে যে কাজটাই দেওয়া হত সে মনযোগ দিয়ে করতো এবং সে সহজেই জিনিসটাকে রপ্ত করতো।’

জাতীয় দলে এই মুহূর্তে মুশফিকের চাইতে বেশি পরিশ্রমি কেউ নেই বলা যাবে চোখ বন্ধ করেই। নিজেকে অন্যদের চেয়ে বাড়তি খাটুনি করাতেই মুশফিকের যত আনন্দ। আর এই অভ্যাসটা এখন নয় ছোট থেকেই নিজের মধ্যে লালন করতেন বলে জানান তার প্রিয় এই কোচ, ‘ছোটবেলা থেকেই সে পরিশ্রমী ছিল এবং সে জানে যে পরিশ্রমের বিকল্প কোন কিছু নাই। বড় হতে গেলে পরিশ্রম করতে হবে। মেধাই সবকিছু নয়। মেধাটাকে জায়গামত দেখতে গেলে আমার কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’

মুশফিক যখন নেটে ব্যাট করেন বোলাররা হয়ে পড়েন ক্লান্ত, মাঝে মাঝে হন বিরক্তও। নেটে ঢুকলে আর বের হতে চাননা জাতীয় দলের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান। নেটের বাইরে কিছু আছে বলে ভুলে যান ঐ সময়টায় ধারণা অনেকের।

তার শৈশব কোচ মতি জানালেন ধারণা নয় বাস্তবেই শুধু অনুশীলন নয় যেকোন কাজই করার সময় পুরো ডুবে থাকেন মুশফিক, ‘ওর সবচেয়ে ভালো গুণ ছিল যে যেখানেই যেত যে জিনিসটা তাকে নির্দেশ করা হত যে এই কাজটা কর সে কাজের মধ্যেই থাকতো। কখনোই স্যারদের কাছে অপ্রিয় হতনা।’

‘এ জন্য তার প্রতি সকলেরই বিকেএসপিতে প্রচুর ভালোবাসা। আজও তাকে মনে রাখে বিকেএসপি ওর উদাহরণটা আমরা দিতে থাকি যে দেখ একটা মানুষ বড় হতে হলে কি করতে হয়। সে পরিশ্রম করতে ভালোবাসে ছোটবেলা থেকে। সে যখন মাঠে যেত দুনিয়ার সব কিছু ভুলে যেত যেন মাঠই তার সবকিছু। যখন সে ক্লাসে যেত ক্লাসই সবকিছু এই যে সুন্দর লাইফের গুছানো অবস্থা এটা সৃষ্টিকর্তারই দান। আসলে জীবনে যারা বড় হয় সৃষ্টিকর্তা তরফ থেকেই শিডিউল তৈরি করা থাকে আমার মনে হয়।’

বিকেএসপিতে কাটানো সময়টায় শিক্ষক-কোচ মতি, হারুণ, নাজমুলদের হাতের ওপর দিয়ে বেড়ে উঠেছেন দেশের ক্রিকেটে অনবদ্য অবদান রাখা মুশফিক। বেড়ে ওঠার সময়টাও শিক্ষক-কোচদের সঠিক নির্দেশনাই মুশফিককে অন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। মুশফিকদের আগলে রাখার পথে নিশ্চয়ই অনেক মজার ঘটনা আছে। সেখান থেকেই মতি শোনালেন একটি, ‘মজার ঘটনা বলতে, একদিন লাঞ্চ আসতে দেরি হচ্ছিল বিকেএসপি থেকে আমাদের খাবার যেত সুস্থ সুন্দর থাকার জন্য। তো লাঞ্চ আসতে দেরি হয়েছে সেই সময়ে আমি সবাইকে বলছি বাইরের কোন খাবার খাবানা। অনেকে ভাজা খায়, অন্যান্য জিনিস খায়।’

‘কোণায় গিয়ে দেখি সে আচার খাচ্ছে। তখন রাগে আমি তারে ধরে কান টেনে দেই । এখনো বলে স্যার আপনার কান টানা আমার এখনো মনে আছে। তবে রাগ ছিল আমার, যেন ভয়ে অন্য কিছুর মধ্যে না জড়াতে পারে তারা। নিজের কাজের মধ্যে যেন থাকে, তারাও সতর্ক থাকতো।’

আলাপের শেষদিকে বিকেএসপির এই ক্রিকেট কোচ জানালেন এখনো মুশফিকের কতটা জুড়ে আছেন তিনি, ‘হ্যাঁ সে যখন ইংল্যান্ডে সমস্যায় পড়ল, ও ওইদিন আমাকে টেলিফোন করে বলছে স্যার আমি আজও যত সাজেশন আছে আমার ক্রিকেট জগতে আপনার এবং ফাহিম স্যার ছাড়া কারওটা গ্রহণ করিনা। কোন সময় যখন দেখা যাচ্ছে ও রান পাচ্ছেনা, খারাপ সময় যাচ্ছে তখনই যোগাযোগ করে। ওর যখন অধিনায়কত্ব খারাপ যাচ্ছিল তখন আমি অভিভাবক হিসেবে জিনিসগুলো ওকে ফিডব্যাক দেই।’

মুশফিকের পাশে থাকতে পেরে নিজেকেও ধন্য মনে করেন মতিউর রহমান যিনি বিকেএসপির ছাত্রদের কাছে মতি স্যার নামে পরিচিত, ‘ও যখন বিপদগ্রস্থ ছিল তখন তাকে সাহায্য করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। এই কারণেই ওর কাছে আমি অনেক বড় একজন মানুষ। আমার মত মানুষ এতটুকুন ছোট মানুষ ওর কাছে যে কত বড় মানুষ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানেনা।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

১৪ তারিখ পর্দা নামছে ব্যাংকার্স চ্যাম্পিয়নশিপ ট্রফির

Read Next

‘এটাই সাকিবের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে’

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
35
Share