কোন অনলে পুড়ছেন মুশফিক?

মুশফিকুর রহিম

বিসিবি সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর নাজমুল হাসান পাপনের বক্তব্যে বিভ্রান্ত হওয়া যেন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের আর কোন বোর্ড প্রধানের সুর বদলের নজিরও খুব একটা পাওয়া যাবেনা। একাধিকবার নানা ইস্যুতে এক নাজমুল হাসান পাপন নিয়েছেন ইউ টার্ন। সবশেষ মুশফিকুর রহিমের পাকিস্তান সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই বিসিবি সভাপতির নানা সময়ের মন্তব্য পর্যালোচনা করলেই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে তার মত দায়িত্ববান একজনের অসংলগ্ন কথাবার্তার।

পাকিস্তান সফর তখনো চূড়ান্ত হয়নি, বোর্ডের তরফ থেকে ফলাও করে গণমাধ্যমকে জানানো হয় পাকিস্তান সফরের ক্ষেত্রে ক্রিকেটারদের মতামতকে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ প্রাধান্য। পাকিস্তান সফর চূড়ান্ত হল, সবাই রাজি হলেও নিরাপত্তা শঙ্কায় নাম সরিয়ে নিলেন মুশফিকুর রহিম। তিন দফার পাকিস্তান সফরের এক দফাতেও যাবেন না সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আর পাকিস্তানে পিএসএলের পুরো মৌসুম আয়োজন হবে বলে ড্রাফটে নামও দেননি দেশের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান।

কেবল এবারের পাকিস্তান সফর নয়, আগামী দুই-এক বছর অন্য বড় দলগুলো নিয়মিত যাওয়ার আগ পর্যন্ত পাকিস্তান সফরে যাবেনই না বলেও পরিষ্কার জানান মুশফিক। তখনো পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক, কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধল প্রথম দফায় টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে আসার পরই। ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হেরে আসে রিয়াদের দল, বোর্ড সভাপতির আক্রমণের শিকার মুশফিকুর রহিম। যেন মুশফিক গেলেই ফলাফলটা হয়ে যেত ভিন্ন। হ্যাঁ, মুশফিকের প্রভাবটা ঠিকই পড়তো দলে কিন্তু ব্যাপারটা যখন নিরাপত্তা শঙ্কায় সেখানে অসন্তোষ প্রকাশের কিছুই ছিলনা।

অথচ বোর্ড সভাপতি নতুন নিয়মই করে দেন এভাবে কোন সফর থেকে নাম সরাতে হলে জানাতে হবে অন্তত ৬ মাস আগে। কিন্তু মজার বিষয় পাকিস্তান সফর চূড়ান্তই হয়েছে দল দেশ ছাড়ার ২ সপ্তাহেরও কম সময় আগে! আরও চমক জাগানো তথ্য কেউ পাকিস্তান যাবে কি যাবেনা সেই অপশনটা রাখা হয়েছে বোর্ডের তরফ থেকেই। এখানেও স্বার্থের সংঘাতে বিসিবি, আপনি নিজেই একটা সুযোগ দিলেন সেই সুযোগ কেউ নিলেও তাঁর উপর চটছেন।

মুশফিকের আগে ব্যক্তিগত কারণে বিশ্রাম নেওয়ার নজির আছে সাকিব, তামিমের। গতবছরই প্রথমে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট ও ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ থেকে ছুটি নেওয়া তামিম পরে সন্তান সম্ভাবা স্ত্রীর পাশে থাকতে ছুটি নেন ভারতের বিপক্ষে সিরিজ থেকেও। কিন্তু মুশফিকের ব্যাপারেই বোর্ডের পাশার দানটা উল্টে গেল, তাও নিরাপত্তার মত স্পর্শকাতর একটা ইস্যুতে নাম সরানোর পরেও।

প্রথম দফার পাকিস্তান সফরের পরই বিসিবি চেষ্টা চালায় মুশফিককে দ্বিতীয় দফার দলে অন্তর্ভূক্ত করতে, ব্যর্থ হয়ে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের দলে না রাখার ইঙ্গিতও খবরের শিরোনাম হয়েছে ভালোভাবে। শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের ফুসফাস হোক কিংবা নিজেদের ভাবনার জায়গায় বদল করে হোক মুশফিককে বাদ দেওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি বিসিবি। তবে তৃতীয় দফার পাকিস্তান সফরে তাঁকে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য উঠেপড়া লাগাটা থামেনি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক ডাবল শতক হাঁকানোর পরেও তাঁকে দু কথা শোনাতে কার্পন্য করেননি নাজমুল হাসান পাপন।

ম্যাচ জয়ের পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নাজমুল হাসান পাপন গণমাধ্যমকে মুশফিক ইস্যুতে বলেন, ‘আমরা আশা করছি যে ও যাবে। সে শুধু না, যাকেই সিলেক্ট করা হবে সেই যাবে। প্রত্যেক চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারেরই যাওয়া উচিৎ। এটা আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা মনে করি একজন ক্রিকেটারকে দেশের কথাও ভাবতে হবে, শুধু নিজের কথা ভাবলে হবে না। নিজের কথা ভাবতে হবে, পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ; তবে সবার আগে দেশ। এই কথাটা সবার মাথায় রাখতে হবে।’

দেশের প্রতি মুশফিকের নিবেদনের প্রমাণ পাকিস্তান সফরে গিয়ে দিতে হবে সেটা আসলেই অদ্ভুত ব্যাপার। কারণ দেড় যুগের বেশি সময়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যে ক্রিকেটার ব্যক্তিগত অজুহাতে ছুটি নেননি একটি ম্যাচ থেকেও তাকেই কিনা দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে হবে?

নাজমুল হাসান পাপন আরও বলেন, ‘যারা গেছে তাদের ভয় ছিলো না? ওরা খেলে আসছে না? তার (মুশফিকুর রহিম) বাড়ির লোকও তো খেলে আসছে। আমি বলতে চাচ্ছি, রিয়াদের কিছু হলে কিছু হবে না। শুধু ওর বেলায় বাড়ির লোক কান্নাকাটি করবে? রিয়াদের কাছ থেকে শুনতে পারে যে কি হয়েছে। বাকি সতীর্থদের কাছ থেকে শুনতে পারে, আমাদের কাছ থেকে শুনতে পারে। পাকিস্তান একটা ভিন্ন ইস্যু, আমি আগে থেকেই বলে এসেছি পাকিস্তান সফরের জন্য আমি কাউকে জোর করবো না। দেখি সবার সঙ্গে কথা বার্তা বললে তারপর মনে হয় ওর যাওয়া উচিৎ।’

মাহমুদউল্লাহকে বাড়ির লোক উল্লেখ করে নিজেদের যুক্তিটা শক্ত করার চেষ্টা বিসিবি সভাপতির। অথচ হিসাব কষলে সম্পর্কের দিক বিবেচনায় মুশফিকের সরাসরি পরিবারের লোক নয় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ভায়রা রিয়াদ মানেই মুশফিকের পরিবার নয়, নিজের বাবা-মা সবার আগে পরিবারের সদস্য বলে গন্য হওয়ার কথা। ব্যাপারটি যদি এমন মুশফিকের শশুর-শাশুড়ির ভয় হচ্ছে ফলে মুশফিক যাচ্ছেনা তখন হয়তো প্রশ্নটা উঠতো, বর জামাই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ক্ষেত্রে শশুর-শাশুড়ির সমস্যা নেই মুশফিকের বেলাতেই কেবল কান্নাকাটি?

সব কিছু বাদ দিয়ে যদি কারও ব্যক্তি স্বাধীনতার দিকটা বিবেচনা করা হয় যেটি আবার আমি নিজেই কাউকে দিয়েছি সেক্ষেত্রে বিসিবির এই দৈত্ব নীতি সত্যি হতাশার। ইতোমধ্যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তৃতীয় দফার পাকিস্তান সফরে যাওয়ার জন্য এতটাই চাপ দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি যে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আজ (৩ মার্চ) ওয়ানডেতেও তাঁকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচকের মাধ্যমে। হয় পাকিস্তান যাবা নাহয় দ্বিতীয় ওয়ানডে থেকে বাদ পড়বা ব্যাপারটা অনেকটা এরকম হয়ে দাঁড়িয়েছে দু পক্ষের মধ্যে।

বিশ্ব ক্রিকেটে নিরাপত্তা ইস্যুতে কোন সফর থেকে নাম সরিয়ে নেওয়ার জন্য কোন ক্রিকেটারের উপর এততা চাপ বোর্ড দিয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাবেনা নিশ্চিতই। নিকট অতীতে এই পাকিস্তান সফরের দল থেকে গতবছর নাম সরিয়ে নেন শ্রীলঙ্কার ১০ সিনিয়র ক্রিকেটার। যাদের মধ্যে নাম ছিল লাসিথ মালিঙ্গা, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস, দীনেশ চান্দিমাল, সুরাঙ্গা লাকমল, দিমুথ করুনারত্নে, থিসারা পেরেরার মত ক্রিকেটাররাও। এরও আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরেই আসেননি ইংলিশ কাপ্তান এউইন মরগান।

কিন্তু কারও ক্ষেত্রেই বোর্ডের এমন চাপের বোঝা দেখা যায়নি। ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত মতামতকে সম্মান দেখিয়েছে সংশ্লিষ্ট বোর্ড। নিকট অতীতে অন্য ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে বিসিবিও ছিল নমনীয় তবে মুশফিকের উপরই কেন এতটা অসন্তোষ বিসিবি বসের সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে কিংবা অজস্র আঁধারের গল্পের মত এই রহস্যও উন্মোচিত হওয়ার আগে বিলীন হয়ে যাবে…

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

পাকিস্তান না গেলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই বাদ মুশফিক!

Read Next

নতুন ঠিকানায় এসে রোমাঞ্চিত আকবর, জয়, সাকিবরা

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
14
Share