‘যে লিটন দুই বছর আগে ছিলাম, সেই লিটন এখন নেই’

লিটন দাস

লিটন দাস মানেই গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে স্বল্পভাষী একজন, সাংবাদিকদের জটিল প্রশ্নের তীর থেকে অনেকটা পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করেন যিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা ঠিক নিজের মত করতে পারেননি, তবুও গণমাধ্যমের রেষানলে খুব একটা পড়েননি কারণ তার ব্যাটিং মান! খেলার ধরণ দেখে লিটনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ রথী-মহারথীরাও, লিটন ঠিক লিটন হয়ে ফেরা মানে আখেরে দেশের ক্রিকেটেরই লাভ। তবে দিনশেষে মান নয়, আধুনিক ক্রিকেটে পারফরম্যান্সটাই আপনার হয়ে কথা বলবে।

২০১৫ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লিটন দাস খেলে ফেলেছেন ৮১ ম্যাচ। তিন ফরম্যাটের কোনটাতেই গড় পার হয়নি ৩০! ৩৪ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে গতকাল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরিসহ সাকূল্যে সেঞ্চুরি দুটি। বলা বাহুল্য অন্য দুই ফরম্যাটে লিটন এখনো ছুঁতে পারেননি তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার। সে হিসেবে ৮১ ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেই লিটন শতকের দেখা পেয়েছেন মাত্র দুটি।

বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের মান নিয়ে প্রশ্নটা বেশ পুরোনো। তাই ঘরোয়া ক্রিকেটের পরিসংখান দিয়ে লিটনের মান মহাত্ম বোঝানো অনেকটা অসাধ্য। মূলত মুগ্ধতা ছড়ানো ব্যাটিং শৈলী দিয়েই উইকেট রক্ষক এই ব্যাটসম্যান নজর কেড়েছেন। সামনে থেকে লিটনের ব্যাটিং দেখলে যে কেউই খুঁজে পাবেন প্রশান্তি। যতক্ষণ ক্রিজে থাকেন চোখ জুড়ানো নিখুঁত শটে কেড়ে নেন আলো। গতকালকের আগে ৩৩ ওয়ানডেতে লিটনের গড় মাত্র একবারই ২৫ ছাড়িয়েছে। সেটিও টিকেনি এক ম্যাচের বেশি, বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অপরাজিত ৯৪ রানের ইনিংসের পর গড় দাঁড়ায় ২৫.১১!

গতকালকের আগে ঐ ইনিংসের পর খেলা ৪ ইনিংসে ৪০ পেরোনো ইনিংসও নেই লিটনের। গড় কমতে কমতে ২৪.৩৩। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তার অপরাজিত ১২৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংসটির পর গড় বেড়ে হয়েছে ২৮.৮৩। তবে লিটন ছন্দে ফিরছেন, লিটন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন লিটন হয়েই এর প্রমাণ মিলবে ২০১৮ সালের এশিয়া কাপের ফাইনাল থেকে।

 

View this post on Instagram

 

Retired Hurt Litton’s career best innings in ODI. #BANvZIM #LKD16

A post shared by cricket97 (@cricket97bd) on

ক্যারিয়ারের প্রথম ১৭ ইনিংসে কোন ফিফটির দেখা না পাওয়া লিটন ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে খেলেন ১২১ রানের নান্দনিক ইনিংস। যে ইনিংসে ছিল লিটনের লিটন হয়ে ওঠার ছাপ। এক ম্যাচ পরেই আবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮৩ রানের ইনিংস। প্রথম ১৭ ইনিংসে কোন ফিফটি না পাওয়া লিটন তিন ম্যাচে দুইবার খেলেন ৮০ উর্ধ্ব ইনিংস। এরপর আবার খেই হারালেন, ফিরলেন বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে এক ম্যাচে ব্যাট হাতে নিয়ে খেললেন ৭৬ রানের ইনিংস।

বিশ্বকাপে প্রথম ব্যাট হাতে নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, ৩২১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় নেমে সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরির সাথে লিটনের ৬৯ বলে অপরাজিত ৯৪ রানের ইনিংসে ৫১ বল হাতে রেখে সহজ জয়। লিটনের দিনে অনেককিছুই হতে পারে আবারও ইঙ্গিত মিলল। এরপর ৪ ইনিংসে আবার হতাশা সঙ্গী লিটনের, যদিও নিজের অভ্যস্ত পজিশন ওপেনিংয়ে নামা হচ্ছিলনা উইকেট রক্ষক এই ব্যাটসম্যানের। ততদিনে অবশ্য একদম সহ্য করতে না পারা কোন হেটারের কাছেও লিটন বার্তা দিয়ে দিয়েছেন তিনিও নিজের দিনে একাই প্রতিপক্ষের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন।

বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে খেলেননি, গত ৮ মাসে ওয়ানডে ছিলনা বাংলাদেশেরও। এই সময়ে ওয়ানডে ম্যাচ না থাকলেও টেস্ট, টি-টোয়েন্টিতে লিটন ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন ভালোই। আহামরি কিংবা কাব্যিক কোন ইনিংস হয়তো ছিলনা তবে শুরুর নড়বড়ে লিটন আস্তে আস্তে পায়ের তলার মাটি শক্ত করছেন বলাই যায়। ক্যারিয়ারের প্রথম ৫ বছরে লিটন কখনোই হতে পারেননি সত্যিকারের লিটন। শেষ দুই বছরে অন্তত এই বার্তাটা ঠিকই দিয়েছেন তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাই যায়। এর বড় কৃতিত্বটা অবশ্য নির্বাচক, টিম ম্যানেজমেন্টকেও দিতে হয়। আস্থা রেখে লম্বা সময় বিনিয়োগ করেছেন সেরাটা পাওয়ার আশায়।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গতকাল (১ মার্চ) নিজস্ব ঢংয়ে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিজেও বলছেন আগের লিটন এখন আর নেই। মূলত সংবাদ সম্মেলনে স্বল্পভাষী লিটন দাস কথা বলেন প্রাণ খুলে, সুযোগ পেলে রসবোধের জানানটাও দেন। এই পরিবর্তন বোঝাতে গিয়েই ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান তুলে আনেন পরিবর্তনে ইস্যু। শুধু সংবাদ মাধ্যম সামলানো নয় লিটনের পরিবর্তনটা এসেছে মাঠের ক্রিকেটে সেটাও বলা বাহুল্য।

নিজের পরিবর্তন প্রসঙ্গে লিটন বলেন, ‘কথা তো আমি সবার সাথেই বলতাম। হয়তো যারা বন্ধু তারাই আমাকে বুঝতো। অপরিচিতদের সঙ্গে আমি কম কথা বলি। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বলি। বিপিএলের সময়ও আমি বলেছি, ব্যাক অফ দ্যা মাইন্ডে আমাকে ওই জিনিসটা অনেক সাহায্য করে। ম্যাচিউরিটি লেভেলটা।’

‘যেটা বিপিএলএ অনেকবার বলেছি। ক্রিকেট খেলা দেখলে অনেক কিছু বোঝা যায়। আমার ব্যাটিং দেখে আপনারাও বুঝতে পারছেন যে আমি যে লিটন দুই বছর আগে ছিলাম সে লিটন এখন নেই। রান করব, আউট হব সেটা এক জিনিস। কিন্তু খেলার ধরণে পরিবর্তন এসেছে।’

ম্যাচ শেষে নিজের ব্যাটিং নিয়ে রিভিউ করা, পর্যবেক্ষণ করা, উন্নতির জায়গাটা ধরার বিষয়ে অনেকটা বেখেয়ালি লিটন বদলেছেন সেসবও, ‘আমি আগে দেখতাম না। এখন যদি আমি শেষ এক বছর দেখি। বিপিএল বলেন বা তার আগে, আমি এগুলোতে রিভিউ করি আমার ব্যাটিং নিয়ে। আমি বুঝি যে আমার ব্যাটিংয়ে অনেক ভুল আছে। কোনগুলো বিষয় পরিবর্তন করা যায়।’

ঘরোয়া ক্রিকেটে সেঞ্চুরিকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলা লিটন ৮১ আন্তর্জাতিক ম্যাচে সেঞ্চুরি পেলেন মাত্র দুটি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর দুই সেঞ্চুরির তুলনা করতে গিয়ে ২৫ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান এগিয়ে রাখেন ভারতের বিপক্ষে এশিয়া কাপের ফাইনালের সেঞ্চুরিটিকে। ব্যাখ্যা করেছেন কারণও, ‘সেঞ্চুরি আমার কাছে অবশ্যই অনেক উপরে। ওটা এশিয়া কাপ ছিল, বড় ম্যাচ। এটা হয়তোবা অতো বড় ম্যাচ না, কিন্তু আমার জন্য বড় ম্যাচ। টিমের হিসেবে যদি চিন্তা করেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আমরা সবাই ভালো খেললে জিতে যাবো। এশিয়া কাপে এই চিন্তা করলে হবে না। সেঞ্চুরি করতে হলে এশিয়া কাপে যে মনোযোগে ব্যাটিং করেছি, এখানেও সেই মনোযোগে ব্যাটিং করেছি। এখানে কোনো কমতি নেই।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরির প্রশ্নে লিটনের উত্তর

Read Next

ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করলো বাঘিনীরা

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
13
Share