মাশরাফির অবসর রহস্য!

মাশরাফি বিন মর্তুজা

অবসর এবং মাশরাফি যেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই মুহূর্তের অন্যতম বড় রহস্য। সবশেষ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগেই গুঞ্জন বিশ্বকাপ শেষেই অবসরে যাচ্ছেন দেশের সফলতম অধিনায়ক। বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগেই রাজনীতিতে জড়ানো সেই সম্ভাবনাকে করেছিল জোরালো। কিন্তু বিশ্বকাপতো বটেই, চোটের কারণে মিস করা শ্রীলঙ্কা সফরেও মাশরাফির মুখ থেকে আসেনি অমন কোন ঘোষণা। এরপর ৮ মাসে ছিলনা বাংলাদেশের কোন ওয়ানডে, বিপিএল দিয়ে ক্রিকেটে ফেরা মাশরাফি তখনও চুপ! বরং জানিয়ে দিলেন খেলে যেতে চান ক্রিকেট, জাতীয় দলে বিবেচিত হোন বা না হোন তা নিয়ে ভাবছেন না তিনি।

তবে বোর্ড পড়েছে বেশ ভালো বিড়ম্বনায়। একদিকে দেশের সফলতম অধিনায়কে হুট করে বাদ দিতে না পারা ,অন্যদিকে আগামী বিশ্বকাপ সামনে রেখে নতুন নেতৃত্ব; দল গুছানোটা জরুরী। এমন পরিস্থিতিতে বোর্ড চায় অবসরের ঘোষণাটা মাশরাফির কাছ থেকেই আসুক, দেশসেরা এই পেসার রাজি হলেই আয়োজন হবে দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিদায়ী অনুষ্ঠান। কিন্তু মাশরাফি আবার নাছোড়বান্দা, অবসর নিয়ে জানাবেন সময় হলেই, জাতীয় দলে বিবেচনা না করা হলেও থাকবেনা আক্ষেপ।

দিন কয়েক আগে বোর্ড সভাপতি জানিয়েছেন জিম্বাবুয়ে সিরিজে অধিনায়ক থাকছেন মাশরাফিই, তবে পরবর্তী সিরিজের আগেই চূড়ান্ত হবে নতুন অধিনায়ক। তবে কয়েকদিনের ব্যবধানেই বোর্ড সভাপতির মুখে অন্য সুর, জিম্বাবুয়ে সিরিজের অধিনায়ক মাশরাফির সম্ভাবনা আছে অধিনায়ক হয়েই পাকিস্তান সফরে যাওয়ার। কিন্তু যাকে নিয়ে এত আলোচনা সেই মাশরাফি কি বলছেন? পাকিস্তান সফরে বোর্ড বিবেচনা করলে যাবেন কি পাকিস্তানে?

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটি মাঠে গড়াবে আগামীকাল (১ মার্চ) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। তার আগে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফিকে জবাব দিতে হয় অবসর, পাকিস্তান সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও। টিম ম্যানেজমেন্ট, নির্বাচকরা বিবেচনায় রাখলে মাশরাফি পাকিস্তান যাবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে টাইগারদের ওয়ানডে দলপতি বলেন, ‘প্রথমত, জানিনা এই সিরিজের পর আসলে কি হবে। বাংলাদেশ দলের প্রয়োজনে আমাকে যেখানেই ডাকা হবে আমি থাকবো।’

‘আমি সবসময় অনুভব করি ক্রিকেট বোর্ড আমাদের অভিভাবক। সুতরাং ক্রিকেট বোর্ড আমাদের কথা একবার, দুইবার, তিনবার নয় ১০ বার চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিবে। এটাই আমরা আশা করি। ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্তকেই আমাদের চূড়ান্ত করা উচিৎ সবসময়। এবং পাকিস্তানে যাওয়ার পর কোন ক্রিকেটারের যদি কিছু হয় আমি বিশ্বাস করি ক্রিকেট বোর্ড আমাদের পরিবারের চাইতে বেশি হার্ট হওয়া উচিৎ। এবং উনারা এটা ১০ বার ভেবেই সিদ্ধান্ত নিবে। আর উনারা ক্রিকেটারদের ১০০ ভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।’

মুশফিকের পাকিস্তান সফর থেকে নাম সরিয়ে নেওয়া নিয়েও কম জল ঘোলা হয়নি। বোর্ড সভাপতিতো প্রতিনিয়ত প্রকাশ করছেন বিরক্তিও। তবে মাশরাফি অবশ্য সম্মান জানালেন মুশফিকের সিদ্ধান্তকে, ‘আর এটা নির্ভর করে (ব্যক্তিগত মতের উপর)। ব্যক্তিভেদে সিদ্ধান্ত হয় ভিন্ন। মুশফিক যায়নি, আমি তার সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সম্মান দেখাচ্ছি। ক্রিকেট বোর্ড থেকে সুযোগ রেখেছিল যে যদি কেউ যেতে না চায় সে যাবেনা।’

নিজের যাওয়া না যাওয়া নিয়ে অবশ্য মুখ খোলেননি দেশসেরা অধিনায়ক, ‘নির্বাচনে যখন ম্যানেজমেন্ট বসবে তখন পাকিস্তান সফরের আগে অবশ্যই ক্রিকেটারদের জিজ্ঞেস করবে সে যেতে চায় কি চায়না। আমাকে যদি নির্বাচন করে, আমাকে যদি প্রশ্ন করে তখন আমি উনাদের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করবো।’

অবসর, বাজে পারফরম্যান্স মিলিয়ে বেশ ভালো আলোচনায় ওয়ানদে দলের অধিনায়ক। তবে এটা বাস্তব প্রক্রিয়ার অংশ বলছেন মাশরাফি, তামিম-রিয়াদদেরও এই সময়টা পার করতে হবে বলে দিয়ে রাখেন ইঙ্গিত, ‘আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে সবকিছু মিলিয়ে হয়তো পারফর্ম করিনি জিনিসটা একটু জটিল জায়গায় আছে। এটা নিয়ে ভেবে তো আমি এখান থেকে বের হতে পারবো না। আমি গ্যারান্টি দিয়েও বলতে পারবো না আমি কালকে ৫ উইকেট পেয়ে সবকিছু শেষ করে দিলাম।’

‘একটা খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে একটা বয়স, একটা সময় আসে, প্রত্যেকটা দিনই তার জন্য চ্যালেঞ্জিং। আমি আসলে ওই সময়টাই আছি। আজ থেকে চার বছর পর তামিম, মুশফিক, রিয়াদ যারা আছে তাদেরও এই সময় আসবে। এটা কিন্তু একটা প্রক্রিয়াই, এটা নিয়ে এতো কিছু ভাবনার আমি দেখিনা।’

প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার মাশরাফি বিন মর্তুজার। ২১৫ ওয়ানডে ম্যাচে ২৬৫ উইকেট নিয়ে আছেন দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ওয়ানডে উইকেট শিকারির তালিকায় শীর্ষে। বারবার চোটে না পড়লে পরিসংখ্যান হতে পারতো আরও সমৃদ্ধ। তবে ক্যারিয়ারের গৌধুলী লগ্নে এক অচেনা মাশরাফির দেখা মিলছে, বল হাতে ব্যাটসম্যানকে ঠিক আগের মত পরাস্ত করা সম্ভব হচ্ছেনা। ক্যারিয়ারের ইতি টেনে দেওয়ার গুঞ্জন উঠেছিক বেশ কয়েকবার। কিন্তু মাশরাফি পরিষ্কার করছেন না ধোঁয়াশা। কবে থামবেন কিংবা নিজের লক্ষ্যটা কি এ নিয়েও রেখে দিলেন রহস্য।

এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বলেন, ‘থামলে তো জানবেন। বারবার একই প্রশ্ন করার কোনও মানে নেই। আপনারা কি কোনও জায়গায় অপরিষ্কার আছেন? একই প্রশ্ন বারবার করার কিছু নেই। বোর্ড থেকে যদি কিছু বলে বা আপনাদের যদি কিছু জানার থাকে, বোর্ডের সিদ্ধান্ত তো অবশ্যই আপনারা বোর্ডকে জানাবেন। বোর্ড বোর্ডের সিদ্ধান্ত জানাবে। আমার সাথে যে আলোচনা হবে সেটা অবশ্যই পাপন ভাই বা বোর্ড সম্পৃক্ত যারা আছে তাদের সাথে হবে। এটা আপনাদের কাছে এসে বলার কিছু নাই।’

সংবাদ সম্মেলনের শেষ প্রশ্নটাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাশরাফির অবসর রহস্য উন্মোচনের উদ্দেশ্যেই ছোঁড়া। কিন্তু এবার মাশরাফি আরও বিরক্ত, ‘একই প্রশ্ন করছেন আপনি। আমার চাওয়া তো আপনাকে আমি আর বলব না। আমি ক্রিকেট বোর্ডকে জানাব, ক্রিকেট বোর্ড যদি চায় আপনাকে জানিয়ে দেবে। আমার যদি জানানোর কিছু থাকে সেরকম অবস্থা আসলে আমি জানিয়ে দেব।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

সংবাদ সম্মেলনে চটলেন মাশরাফিঃ ‘আমি কি চোর?’

Read Next

সৌরভ গাঙ্গুলিকে নিয়ে বায়োপিক, প্রধান চরিত্রে হৃত্বিক!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
21
Share