চেনা আঙিনায় নতুন রূপে ফিরে যেমন কাটলো আকবরদের

আকবর আলি শাহাদাত হোসেন তানজিদ হাসান তামিম পারভেজ হোসেন ইমন মাহমুদুল হাসান জয় শরিফুল ইসলাম

যুব বিশ্বকাপের স্কোয়াডে বিকেএসপি (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) থেকে জায়গা পেয়েছিলেন অধিনায়ক আকবর আলিসহ ৭ ক্রিকেটার। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম এক অধ্যায় রচনা করে দেশে ফিরে ঘরে ফিরেছে টাইগার যুবারা। তবে ৬ ক্রিকেটারের সুযোগ হয়নি খুব বেশি সময় পরিবারের সাথে কাটানোর। বিকেএসপিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুইদিনের প্রস্তুতি ম্যাচের স্কোয়াডে ডাক পেয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি ফিরতে হয়েছে ঢাকায়।

এই ৬ জনের তিনজনই আবার বিকেএসপির। ফলে বিশ্বজয়ের পর অধিনায়ক আকবর আলি, মাহমুদুল হাসান জয় ও পারভেজ হোসেন ইমনদের বিকেএসপিতে ফেরা হল একদমই নতুন রূপে। বিশ্বকাপের আগে আকবর, ইমন, জয়রা এভাবে বিকেএসপিতে এর আগে আসেননি  কখনো। গায়ে তারকা তকমা সেঁটে গিয়েছে বলাই যায়, অন্তত তাদের বিকেএসপি সহপাঠী, ছোট ভাই, কোচ কিংবা পরিচিত অন্যদের কাছে।

দুইদিনের প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠের খেলার বাইরের পুরো সময়টাই তাদের মেটাতে হয়েছে ভক্তদের সেলফি তোলার খায়েস, এখানকার নিরাপত্তাকর্মী, মাঠকর্মীদের চোখেমুখেও আকবর, জয়দের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় অন্যরকম এক আনন্দের ঝিলিক লক্ষ্য করা যায়। তাদের চাহনী, চোখের ভাষা বলতে চায় এই আকবর, জয়, শামীমরাতো আমাদেরই।

received 329987027942119

প্রথম দিন বিকেএসপির গেটে পোঁছাতেই দেখা যায় বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পাওয়া সাত ক্রিকেটার আকবর আলি, পারভেজ হোসেন ইমন, প্রান্তিক নওরোজ নাবিল, মাহমুদুল হাসান, শামীম হোসেন, তানজিম হাসান সাকিব ও হাসান মুরাদের ছবি সম্বলিত বড় বড় দুটো ব্যানার ঝুলছে। তাদের নিয়ে বিকেএসপি পরিবারের গর্ব করার মত ব্যাপারটির জানান দেওয়া হয়েছে সেসবে।

প্রথম দিনের খেলা শুরুর আগেই বিকেএসপির প্রধান কোচ মাসুদ হাসান এসে হাজির শিষ্যদের খেলা দেখতে। বিশ্বজয়ী আকবরদের গড়ে তোলার কারিগর যিনি তাকে কাছে পেয়ে গণমাধ্যমের আগ্রহের ছিলনা কমতি। প্রেসিডেন্ট বক্সে বসে আকবরদের অদ্যোপান্ত জানালেন মাসুদ হাসান। বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানও তারই ছাত্র। ব্যক্তিগতভাবে সাকিবকে নিয়ে গর্ববোধ করেন, বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার আমার ছাত্র। যদিও এই আনন্দকে ছাপিয়ে গেছেন আকবররা।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আকবরদের নিয়ে গর্বের জায়গাটা বড় উল্লেখ করে মাসুদ হাসান জানান, ‘সাফল্য হিসেবে বিশ্বের এক নম্বর হওয়া এক জিনিস আর বিশ্বকাপ জয় অন্য জিনিস। এটা অনস্বীকার্য হয়তো সাকিবের বিষয়টা হল গল্প করার মত আমার ছাত্র বিশ্বের এক নম্বর হয়েছে, র‍্যাংকিংয়ে নাম্বার ওয়ান হওয়া। আর এটা চ্যাম্পিয়ন, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন সে যে পর্যায়েরই হোক না কেন। তার মানে বিশ্বের সেরা একটা দেশ। এটা লেভেল যদি ধরি অবশ্যই আনন্দের, গর্ব করার মত একটা বিষয়। বিশ্বের এক নম্বর দল, তাইনা?’

ওই আড্ডার ফাঁকেই জানালেন ঘরের ছেলে আকবরদের জন্য বিকেএসপির পক্ষ থকেও অপেক্ষা করছে বড় সংবর্ধনা। সাত জনের তিনজন প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার সুবাদে বিশ্বজয়ের পর এসেছেন নিজেদের আঁতুড়ঘরে। বাকি চারজন আছেন পরিবারের সাথে, সবাইকে এক করে দ্রুতই মহা ধুমধামে দেওয়া হবে অভ্যর্থনা, ‘আমরা তাদের একটা অভ্যর্থনা দিবো কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতও এরকম আসলে কাছে পাচ্ছিনা। এই যে এটায় ( প্রস্তুতি ম্যাচ) যারা যারা খেলছে এদের পাচ্ছিনা বলেই আয়োজন করতে পারছিনা। মহাপরিচালক নিজেই অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্য বিকেএসপির পক্ষ থেকে চাইছে।’

মাঠের বাইরে বিকেএসপির পরিবেশ আকবরদের জন্য অবশ্যই এখন বদলে গেছে নানাভাবে। তবে গুরু-শিষ্যের আলোচনা, পরামর্শ সবই চলছিল আগের মত। দুইদিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ফাঁকা সময়ে কোচ মাসুদ হাসানের সাথে লম্বা সময় পার করেছেন আকবর, জয়, ইমনরা। বাদ যাননি বিকেএসপিরই ছাত্র আমিনুল ইসলাম বিপ্লব, সুমন খানরাও।

received 122989305808337 received 824964051311002

সাদা বলে বয়সভিত্তিক খেলে অভ্যস্ত আকবরদের হুট করে খেলতে হল লাল বলে, তাও আবার বিশ্বকাপ ধকল সামলিয়ে বাড়ি ফেরার দিন কয়েকের মাথায়। ছিলনা কোন অনুশীলনের সুযোগ। মানসিক, শারীরিকভাবেই ক্লান্ত বলা চলে। জিম্বাবুয়ের মত টেস্ট খেলুড়ে দলের  বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ঘরানার ম্যাচে প্রথমবার খেলতে নেমে কেমন করবে জয়, ইমন, শাহাদাত, আকবর, তামিম, শরিফুলরা ছিল সবারই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।

১৮ তারিখ থেকে শুরু হওয়া জাতীয় দলের অনুশীল ক্যাম্পের চাইতে অনেকের কাছে বিকেএসপির তিন নম্বর মাঠের প্রস্তুতি ম্যাচটিই পেয়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের বাড়তি নজর। জিম্বাবুয়ের অনুশীলনের জন্য প্রস্তুতি ম্যাচের আয়োজন। নিজেদের ইচ্ছেতেই আগে ব্যাট করে সফরকারী দল। প্রথমদিনে ৭ উইকেটে ২৯১ রান তোলে দলটি, দিনের প্রথম ও শেষ সেসনে বাংলাদেশী বোলারদের পরীক্ষা নেন প্রিন্স ম্যাসভাউর, কাসুজা, মারুমা, মুম্বা,লোভু রা। তবে দ্বিতীয় সেশনে যুব বিশ্বকাপে বল হাতে না নেওয়া শাহাদাত হোসেন দিপুর ৮ ওভারের স্পেলে স্বস্তি পায় বিসিবি একাদশ।

৮ ওভারে ১৬ রান খরাচায় তুলে নেন তিন উইকেট, যুব দলের আরেক বোলার শরিফুল ইসলাম পেয়েছেন ১৫ ওভারে ৪৫ রান খরচায় ১ উইকেট। প্রথমদিন শেষে শরিফুল অবশ্য বলেছেন বাংলাদেশের এমন উইকেটে বল করা পেসারদের জন্য কঠিনই। এমন উইকেটে বল করাটা উপভোগ করতে পারেন না। অন্যদিকে শাহাদাত জানিয়েছেন পরিবারের সাথে বেশি সময় কাটাতে না পারলেও নিজের ভবিষ্যতের জন্য এমন ত্যাগ স্বীকার করে ম্যাচ খেলাতে আক্ষেপ নেই তার।

পরদিন নিজেরা আর ব্যাট করতে নামেনি জিম্বাবুয়ে। বোলিংটাও ঝালিয়ে নিতে ব্যাট করতে পাঠায় বিসিবি একাদশকে। লাঞ্চের আগেই ৬৯ রান তুলতে ৫ উইকেট হারিয়ে বসে আল আমিন জুনিয়রের দল। যাদের ব্যাটিং দেখার অপেক্ষায় সবাই, যুব দলের ইমন, জয়, শাহাদাত  ও আকবর আলি হতাশ করেছেন ভালোভাবেই। কোন অনুশীলন ছাড়া আন্তর্জাতিক ঘরানার এমন একটি ম্যাচে নেমে হুট করেই ভালো করা যদিও কষ্টসাধ্য বিষয়ই।

৬৬ বলে ৩৪ রান করা ওপেনার পারভেজ হোসেন ইমন শুরুটা পেয়েছিলেন ভালোই। বাঁহাতি অর্থোডক্স আইনসলি লোভুর আগের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে বল হারিয়ে পরে বলে খেলতে যান শট। ফেরেন শটে দাঁড়ানো নিয়াউচির হাতে ক্যাচ দিয়ে। ৫ বলে ১ রানের বেশি করতে পারেননি মাহমুদুল হাসান জয়, শুমার বলে ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটের পেছনে চাকাভাকে। বল হাতে ৩ উইকেত নিলেও শাহাদাত হোসেনের মূল কাজ ব্যাট হাতেই দলকে টেনে নেওয়া। এ দফায় ব্যর্থ হয়েছেন শাহাদাতও, ফিরেছেন ২ রান করে।

দলের বিপর্যয়ে ৬ নম্বরে নামা আকবর আলিতে ভরসা দেখেছে প্রায় সবাই, এবার আর লড়াইটা চালাতে পারেননি আকবর। মুতুম্বোজির গুগলি বুঝতে না পেরে ১ রান করে হয়েছেন বোল্ড। তবে যুবাদের হয়ে নিজেকে চেনাতে আগে থেকেই যেন প্রস্তুত ছিলেন যুব দলের ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। যুব বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা বধের ম্যাচে তার ব্যাট থেকে আসে ৮০ রান। সেমিফাইনাল-ফাইনালে ব্যাট কথা না বললেও জিম্বাবুয়ের মত দলের বিপক্ষে দুই দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ঠিকই কথা বলেছে তামিমের ব্যাট।

কার্ল মুম্বা, চার্লটন তশুমা ও ক্রিস্টোফার পোফুর পেস, বাউন্সে বেশ কয়েকবার আঘাত পেলেও লড়াই করেছেন সাহসের সাথে। দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেন অধিনায়ক আল আমিনের সাথে ২১৯ রানের জুটিতে। নিজে তুলে নেন ঝড়ো সেঞ্চুরি, মাত্র ৮৭ বলে ১০ চার ৫ ছক্কায় সেঞ্চুরি করা তামিম শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ছিলেন ৯৯ বলে ১৪ চার ৫ ছক্কায় ১২৫ রানে।

সঙ্গী কাপ্তান আল আমিনও পেয়ে যান সেঞ্চুরি। ম্যাচ শেষে আল আমিন প্রশংসা করেন তামিমের সাহসীকতার, ‘ ওর ব্যাটিং দেখে আমার যেটা ভালো লেগেছে অনেক সাহসী, স্বাভাবিক খেলা খেলেছে। ও চেষ্টা করছে ওভাবে ব্যাট করার, ও অন্যকিছু চিন্তা  করছিলনা, ‘আমি যেমন খেলি তেমনটাই খেলবো’ এমন একটা ব্যাপার ছিল। আমার মনে হয় এ জিনিসটা ওর মধ্যে ছিল।’

দিনের খেলা প্রায় দেড় ঘন্টার বেশি বাকি থাকলেও দুই অধিনায়কের সমঝোতায় ড্রতেই শেষ হয় ম্যাচ। জিম্বাবুয়ের প্রস্তুতির ব্যাপারটা তাদের কাছেই থাকুক, তবে প্রথমবারের মত টেস্ট খেলুড়ে কোন দেশের জাতীয় দলের বিপক্ষে খেলতে পারার অভিজ্ঞতা নিশ্চিতভাবেই কাজে লাগবে আকবর, ইমন, জয়, শাহাদাত, শরিফুলদের। আর সেঞ্চুরি পাওয়া তামিমতো পেয়ে গেলেন আত্মবিশ্বাসের অন্যতম রসদও।

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

পাকিস্তানের বিপক্ষে বাঘিনীদের রোমাঞ্চকর জয়

Read Next

উমর আকমলকে নিষিদ্ধ করেছে পিসিবি

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
8
Share