সরল অংক প্রমাণিত

19113179 10207124674234249 71445212 n
Vinkmag ad

১.
টেলিভিশন পর্দায় তখন ১০ ওভার শেষ, রানের খাতায় মাত্র ২৪ রান এবং প্রথম তিন ব্যাটসম্যান সাজঘরে বিমর্ষ। আমি একজন সমর্থক হিসেবে সরল কিছু অংক করলাম। প্রয়োজন ২৪২ রান, হাতে চারটি ব্যাটসম্যান। প্রত্যেকে ৬০ করে করলেও জয়টা এসেই যায়। কিন্তু দলীয় রান যখন ৩৩, সরল অংকের একটু বদল এসে পড়লো, চরম দুর্বল ফুটওয়ার্কের দরুণ মুশফিকুর রহিমকেও সাজঘরে ফিরতে হল। ধারাভাষ্যকার অনেকটা একই ডেলিভারির মুখোমুখি হওয়াটা তুলনা করে দেখালেন, কিভাবে কিউই কাপ্তান দায়িত্ব নিয়ে মোকাবেলা করেছিল, কিভাবে বাংলাদেশ টেস্ট দলের কাপ্তান তা দায়িত্বহীণতার সাথে ভুল করল। পার্থক্যগুলো হয়তো এভাবেই এসে যায় এবং দু’দলের দক্ষতা এবং প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ধারাভাষ্যকারেরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে সমালোচনা করছিলেন বাংলাদেশ দলের তৎকালীন অবস্থাকে। বহু সমর্থকদের মতন তাঁরাও হয়তো মনে-মনে অংক কষে কিউই কাপ্তান উইলিয়ামসনের ব্যক্তিগত ইনিংসকেই বাংলাদেশের দলীয় ইনিংস ভেবে বসেছিলেন। ভাবাটাও অস্বাভাবিক নয়, এই আসরের প্রস্তুতি ম্যাচে ভুগেছে টাইগাররা এবং এই ম্যাচে মুশফিকুর রহিমের উইকেট পর্যন্ত সুবিধাই করতে পারছিলেন না কোনো ব্যাটসম্যান। এরপর মাহমুদুল্লাহ’র প্রত্যাবর্তন চেনা ভঙ্গিমায়।

২.
বাংলাদেশ কাপ্তান শুরুতে কৌশল ও অভিজ্ঞতার ভাল প্রয়োগ দেখালেও, অপর প্রান্তের বোলার থেকে সুবিধা বেশ সফলভাবেই আদায় করে নিচ্ছিলেন কিউই ওপেনার মার্টিন গাপটিল। প্রথম দুই ওভারে মাশরাফি বিন মর্তুজা ১টি রান দিলেও কিউইদের প্রথম চার ওভারে রান ওভারে রান আসে ২০। পঞ্চম ওভারে কাপ্তান নিজেও সুবিধা করতে না পারায় সিদ্ধান্ত বদলান এবং নিজের অপরপ্রান্তের বোলার বদলে তাসকিনকে ফেরান। তাৎক্ষণিকভাবে সফল না হলেও, স্পেলে বদল প্রথম উইকেটের দেখা দেয়, তাসকিন তুলে নেন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে প্রথম উইকেট। তবে, বাংলাদেশ দলের জন্য আঁধার তখনো কাটেনি, গাপটিল ছিলেন ক্রিজে। নিজের অসামান্য দক্ষতা দিয়ে রানের চাকা সচল রাখছিলেন নিজ প্রান্ত থেকে। তিনিও ফিরে যান ৬৯ রানের ঘরে। এরপর বাংলাদেশ দলের বিপক্ষে ওডিআইতে এপর্যন্ত সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান রস টেলরকে নিয়ে কিউই কাপ্তান উইলিয়ামসন যেন বিপদ সংকেত দিচ্ছিলেন। রানরেট ধরে রেখে দৃষ্টিনন্দন শট এবং দীর্ঘ ইনিংস খেলবার মনস্থিরতা দেখাচ্ছিলেন। ম্যাচের শুরুতে পিচে কিছুটা টার্নের সুযোগ পেয়ে মাশরাফি কাজে লাগাতে পারলেও, ধীরে-ধীরে তা কিছুটা মলিন হওয়ায় ২৭ ওভার পর্যন্ত কিছুটা নির্বিঘ্নেই ক্রিজে সময় কাটাচ্ছিলেন কিউই ব্যাটসম্যানেরা। কিন্তু হঠাৎ বোলিং এ পরিবর্তন এবং আকস্মিক চাপে দুই ব্যাটসম্যান রস টেলর ও কেন উইলিয়ামসনের ব্যাটিং ছন্দে দেখা দিল অসুবিধা। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই বোলাররা চেষ্টা চালালো রানের খাতায় কৃপণতা। এরপর ২৯.৬ ওভারে চাপ প্রয়োগের ফল পেল টাইগারেরা। অস্থিরতার ভুলে রান আউটের ফাঁদে পড়লেন কিউই কাপ্তান এবং কাঙ্ক্ষিত ব্রেক-থ্রু আসলো বাংলাদেশের পক্ষে, মোসাদ্দেকের থ্রোতে, সাকিবের সমাপ্তিতে।

এরপরও পার্টনারশীপের লক্ষণ দেখা গেলেও রানরেটের দিকে কিছুটা উত্থানপতন দেখা যাচ্ছিল। বাংলাদেশের বোলাররা তাঁদের চাপ প্রয়োগে কোনো আপোস না করে এগিয়ে যাচ্ছিল। ফলাফল, ২০১ রানে আরো একটি উইকেট পতন, তুলে নিলেন দেশের গতিতারকা তাসকিন আহমেদ। ম্যাচের এক সময়ে স্কোর প্রেডিকশন যখন ৩০০ পেরিয়ে কোনোকিছু, এখান থেকে যেন মোড় নিল পুরোপুরিভাবে, কৃতিত্বটা বাংলাদেশের কাপ্তান মাশরাফির প্রাপ্য। অনেকক্ষণ ধরেই কিউইরা একটি মজবুত ইনিংসের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল আর এ সময়ে টাইগার কাপ্তান বুঝতে পারলেন, ‘কিছু একটা করতে হবে’। অতঃপর, মোসাদ্দেককে নিয়ে বিচক্ষণতা দেখালেন তিনি এবং কিউইদের পতন যেন আরো নিয়মিত হতে লাগলো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশ দলের সেরা বোলিং ফিগার গড়ে তুললেন মোসাদ্দেক সাকিবকে পিছে ফেলে, তুলে নিলেন ৩টি উইকেট ১১ রানের বদলে। ইনিংসের মাঝ ভাগ থেকে অসাধারণ ডেড বোলিং এর দরুণ কিউইদের থামতে হল ২৬৫ রানে ৮ উইকেটের বিনিময়ে।

৩.
দ্বিতীয় ইনিংসের ১৩তম ওভার। সাকিবের চারে দর্শকেরা কিছুটা স্বস্তি পেল। এরপর প্রান্ত পরিবর্তনের পর রিয়াদের ব্যাট থেকে আসল আরেকটি চার। প্রবাসী বাঙালীদের জন্য এটা বেশ সান্ত্বনার ছিল, আবেগী সমর্থকদের জন্যে তা কিছুটা আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়াল। যেখানে খোঁড়াচ্ছে পুরো দল, সেখানে বোল্টের এক ওভারে দু’টো বাউন্ডারি! ধারাভাষ্যকার হয়তো বাধ্য হয়েই প্রশংসা করলেন দলীয় রান বিবেচনা না করে।

শুরুটা তাঁরা যেমন করেছেন, শেষটাও তেমনই অসাধারণ। বাংলাদেশ দলের সর্বোচ্চ পার্টনারশীপ (২২৩ রান) গড়েছেন। এক্ষেত্রেও ধারাভাষ্যকার প্রশংসায় ডুবে ছিলেন। এবার পরিবর্তন আসল বিবেচনায়। কেননা, দলের অবস্থান এখন অকল্পনীয়ভাবে ভিন্ন- সাকিবের মাঠ ত্যাগের পূর্বে বাংলাদেশ দলের জয়ের জন্যে প্রয়োজন মাত্র ৯ রান এবং পার্টনারশীপ ২২৪ রান।
শেষটা এনে দিলেন থার্ড ম্যান অঞ্চলে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ম্যাচজয়ের অন্যতম নায়ক মোসাদ্দেক হোসেন।

৪.
বহুকাল আগে এক ম্যাচে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ করুণ হয়েছিল। ক্রিজে তখন উইকেট-কিপার ব্যাটসম্যান খালেদ মাসুদ (দুঃখিত বিপক্ষ দল ও সাল বলতে না পারায়)। বাংলাদেশ দলের প্রয়োজন ছিল ২০০ রান, হাতে ছিল ১০০ বল। সে বয়সেই হয়তো সরল অংকের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। আমি মনে-মনে ভেবে বসলাম, প্রতি বলে ২ করে রান নিলে জয়টা নিশ্চিত! আমার জীবনের অন্যতম শিক্ষা হল; ক্রিকেট সরল অংক মানে না। আজকেও রিয়াদ-সাকিবের খেলা চলাকালীনে দু’জনের সেঞ্চুরির মতো বাতুল ভাবনা মনে এসেছিল। কেননা ভয় ছিল, মোসাদ্দেকের পর ব্যাটসম্যান নেই এবং টেইল-এন্ডার নিয়ে আমাদের ভোগান্তি বেশ দৃষ্টিকটু।

কি হল মাঠের মাঝে? আগেই জানিয়েছি, বাংলাদেশের ওডিআই ইতিহাসের সর্বোচ্চ পার্টনারশীপ আমরা দেখেছি। কিন্তু, কি করে হল? প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন ইয়ান বিশপ, ম্যাচপরবর্তী সাক্ষাৎকারে। উত্তরটা বেশ সোজাসাপটা দিলেন মাহমুদুল্লাহ। “আমরা ক্রিজে তেমন কথা বলিনি। আমরা শুধু চেয়েছি খেলে যেতে।” সাকিবেরও উত্তর অনেকটা একই-“আমরা ক্রিজে তেমন কথা বলিনি। চেয়েছি ৪০-৫০ ওভার পর্যন্ত খেলে যেতে।” শুধুই কি চাওয়া ছিল? ইনিংস ব্রেকে অনেকেই আরেকটি কার্ডিফবধ চেয়েছিলেন। কিন্তু, মুশফিকের ফিরে যাওয়ার পর ক’জনই বা ‘চেয়েছিলেন’?

চাওয়ার সাথে ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওডিআই ইতিহাসের সেরা প্রফেশনালিজম এর প্রদর্শন। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনের দারুণ সুযোগ নিয়েছিলেন কেন উইলিয়ামসন। এখানকার ‘হঠাৎ পরিবর্তন’ বুঝেই টসে জিতে ব্যাটিং করে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশের বোলাররা প্রথম অর্ধভাগে কন্ডিশনের খুব সুবিধা করতে না পারলেও, কিউইরা দ্বিতীয় ইনিংসে সেই পরিবর্তনের সুযোগ পেয়ে, পিচে অপ্রত্যাশিত বাউন্স এবং টার্ন প্রয়োগ করে প্রথম ১৫ ওভারে দারুণ সফল ছিলেন। কিন্তু ধীরে-ধীরে সেই সুযোগেও কিছুটা পরিবর্তন আসে এবং রিয়াদ-সাকিব মনোযোগী হবার ক্যারিয়ারসেরা দৃষ্টান্ত দেখান। কোনো ধারাভাষ্যকার হয়তো একটি শট বের করে দেখাতে পারবেন না যেটা ছিল কিউইদের সুযোগ করে দেবার মতন। ঝুঁকি প্রায় ছেড়ে দিয়ে গ্রাউন্ড শটে প্রাধান্য দিয়ে এবং প্রান্ত পরিবর্তন করেই প্রায় সময় রানের চাকা সচল রেখেছেন তাঁরা। দীর্ঘ পার্টনারশীপও ৬ রানরেটের উপরে নিয়ে এসেছেন (২০৯ বলে ২২৪ রান) সাবলীলভাবে- যা সত্যিই অকল্পনীয়!

ইংলিশ কন্ডিশনে শুধু দক্ষতার জোরে জয় আনা যথেষ্ট নয়। বরং কন্ডিশনের বিবেচনা ম্যাচের অনেক বড় প্রভাবক। একারণে, দক্ষতার সাথে বিচক্ষণতা একটি অস্ত্রই বটে। কেন উইলিয়ামসন সেটির সেরা ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। টাইগার কাপ্তানের বোলিং বিচক্ষণতায় ঘায়েল হবার পরও নিজেদের বোলিং দিয়ে আক্রমণ করেছেন যথাসম্ভব উপায়ে। কিন্তু, কন্ডিশনের সেরা বিবেচনা হয়তো এসেছে রিয়াদ-সাকিবের ধৈর্যশীল জেদের মধ্য দিয়ে। আমারো দু’টি সেঞ্চুরির বাচ্চাসুলভ আবদার কিংবা অংক মিলে গেল অকল্পনীয়ভাবে। এরপর- আরো একটি কার্ডিফবধ, বিদেশের মাটিতে আরো একটি কিউইবধ, কার্ডিফে দু’টি জয়েরই মাঠের একমাত্র সাক্ষী খেলোয়াড় মাশরাফি, বাংলাদেশ ক্রিকেট-এর ওডিআই ইতিহাসের সেরা পার্টনারশীপ এবং সেরা প্রফেশনালিজম দেশের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটসম্যান থেকে, রিয়াদের আরো একটি জয়ের প্রান্ত পর্যন্ত অপরাজিত ইনিংস, সাকিবের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফিরে আসা এবং একটি সরল অংক প্রমাণিত।

৯৭ ডেস্ক

Read Previous

রাশিদ খানের স্পিন-বিষে হারলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ

Read Next

অস্ট্রেলিয়ার বাঁচা মরার ম্যাচে আগে ফিল্ডিংয়ে ইংল্যান্ড

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
0
Share