শচীন টেন্ডুলকার; কিংবদন্তীদের কিংবদন্তী

শচীন
Vinkmag ad

হবে হবে করেও কেন জানি হচ্ছিল না। যেখানেই যাচ্ছিলেন, সবার মুখেই ছিল এই প্রশ্ন। কবে হবে “সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি”? ৯৯তম সেঞ্চুরির পর কেটে গেছে ততদিনে ৪৪০টি দিন। খুব কাছে গিয়েও ফিরছিলেন কয়েকবার। তারপর এশিয়া কাপ খেলতে বাংলাদেশে এলেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে অবশেষে পেয়ে গেলেন সেই কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরি। তাঁর এই মাইলফলকে পৌছানোর আগে কেউ কখনো ভাবতেও পারেনি, কোন মানুষের পক্ষে এই মাইলফলকে পৌছানো সম্ভব। তবে একটা ব্যাপারে সবাই ছিল একমত। যদি কেউ একজন সেটা করতে পারে, সেটি হবেন তিনিই। কেননা একজন ব্যাটসম্যানের পক্ষে যত রেকর্ড নিজের করে নেয়া সম্ভব, প্রায় সবগুলোই তিনি নিজের করে নিয়েছিলেন অনেক আগেই। অনেকের চোখেই তিনি সর্বকালের সেরা। কারো কারো চোখে তিনি “ক্রিকেট ঈশ্বর”। তিনি আর কেউ নন, তিনি “শচীন রমেশ টেন্ডুলকার”।

128943

১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল জন্ম নেয়া টেন্ডুলকার, মাত্র ১৬ বছর বয়সে অভিষিক্ত হন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে। প্রতিপক্ষ ছিল চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান। অভিষেকেই ওয়াকার ইউনুসের বাউন্সারে নাক ফেটে যাবার গল্পটা ক্রিকেটে আগ্রহ থাকা প্রায় সকলেরই জানা। পরের বলেই চার হাঁকিয়ে নিজের আত্মপ্রত্যয়ী চরিত্রটার বার্তা ছড়িয়েছিলেন তিনি সেদিনই। সেই ম্যাচেরই দ্বিতীয় ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরী করে নিজের আগমনী বার্তা জানান দিয়েছিলেন তিনি। এরপরে আর কখনোই পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। শুধু সামনেই এগিয়ে গেছেন তিনি, নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

খেলেছেন ২০০ টেস্ট ম্যাচ। ৫৩.৭৯ গড়ে রান করেছেন ১৫৯২১। সেঞ্চুরি ৫১টি, হাফ সেঞ্চুরি ৬৮টি। একদিনের ক্রিকেটে খেলা ম্যাচের সংখ্যা ৪৬৩টি। ৪৪.৮৩ গড়ে রানের সংখ্যা ১৮৪২৬। ৯৬টি হাফ সেঞ্চুরির পাশে জ্বলজ্বল করছে ৪৯টি সেঞ্চুরি। টি-২০ ক্রিকেটে ভারতের জার্সি গায়ে ম্যাচ খেলেছেন মোটে ১টি। রান করেছেন ১০টি। বল হাতেও কম যাননি তিনি। টেস্টে উইকেট সংখ্যা ৪৬টি। ওয়ানডেতে ১৫৪টি, সেরা বোলিং ফিগার ৫/৩২।

D43G2DBXsAExAs0

বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ছিল বিস্ময় জাগানিয়া। ক্রিকেটের এই সর্বোচ্চ আসরে তিনি ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন ৫বার। ম্যাচ খেলেছেন ৪৫টি। ৫৬.৯৫ গড়ে রান করেছেন ২২৭৮। ৬টি শতকের সাথে অর্ধশতক ১৫টি। টেস্ট আর ওয়ানডে, দুই ধরণের ক্রিকেটেই সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড, সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড তাঁর। দুই ধরণের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ডটিও তাঁর দখলে।

আসলে হাতে গোনা দুই একটি রেকর্ড ছাড়া ব্যাটিং এর সবগুলো রেকর্ডই তিনি নিজের করে নিয়েছেন। সবার আগে পৌছেছেন সাদা বলের ক্রিকেটে “ডাবল সেঞ্চুরি”র মাইলফলকে। এটি যে সম্ভব, তাঁর সেই ডাবল সেঞ্চুরির আগে কেউ কখনো কল্পনাই করেনি। তিনি সেটি করেছেন, সবচেয়ে যোগ্যতম ব্যাটসম্যানের হাত ধরেই তাই এসেছে এই মাইলফলক। ব্যাট হাতে শাসন করেছেন পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় জুড়ে। খারাপ সময় এসেছে। সেই সময়কে পেছনে ফেলে তিনি বারবার ফিরে এসেছেন আরো দুর্দান্তভাবে, আরো আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে।

images

সেই ছোট্টবেলায় স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বকাপ জয়ের। ২০০৩ এর আসরে খুব কাছে গিয়েও ফিরতে হয়েছিল শূণ্য হাতে। নিজের শেষ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠ ওয়াংখেড়েতে পূরণ হয় সেই স্বপ্ন। তিনি বিশ্বকাপ না জিতলে গোটা ক্রিকেট ইতিহাসেই একটা অপূর্ণতা থেকে যেত। ২০১১ সালে ভারতের বিশ্বকাপ জয় সেই অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দেয়। তাঁর রাজ মুকুটে যুক্ত হয় আরো একটি পালক।  

সারাটা ক্যারিয়ার জুড়ে বহন করেছেন ভারতের শতকোটি মানুষের প্রত্যাশার চাপ। কখনো নিরাশ করেননি তিনি। ভারতের অজস্র মানুষ টিভির পর্দায় চোখ রাখতো শুধু টেন্ডুলকারের ব্যাটিং দেখতে। গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে বদলে দিয়েছিলেন তিনি তাঁর মায়াময় ব্যাটিং দিয়ে। তাঁর দুর্দান্ত স্রেইট ড্রাইভ, কাভার ড্রাইভ, পুল, হুক- একেকটা শট ছিল চোখের জন্য প্রশান্তি। মুগ্ধ চোখে গোটা ক্রিকেট দুনিয়া বুঁদ হয়ে থাকতো, মন্ত্রমুগ্ধের মত উপভোগ করতো তাঁর ব্যাটিং।

তাঁর জন্য মন্দিরে মন্দিরে প্রার্থনায় বসতো ভারতের ক্রিকেটপ্রেমী জনতা। ক্রিকেটের প্রতি, দেশের প্রতি তাঁর আত্মনিবেদন কেমন ছিল, তার কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের সময়। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। সেই সময়ে দলেরও ছিল তাঁকে খুব বেশি প্রয়োজন। শোককে পাশ কাটিয়ে তিনি ফিরে যান ইংল্যান্ডে, ফিরেই তিনি খেলেন ১০১ বলে ১৪০ রানের অপরাজিত এক দুর্দান্ত ইনিংস, কেনিয়ার বিপক্ষে। সেই থেকে শুরু। তারপর থেকে যখনই তিনি শতকের দেখা পেয়েছেন, হেলমেট খুলে আকাশে খুঁজে ফিরেছেন তাঁর প্রিয় বাবাকে। তাঁর কাছে তাঁর বাবা ছিলেন সবসময়ের আদর্শ। সেই মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার শোক যেন তাঁকে আরো দৃঢ় করে তুলেছিল।

D42dcGsUEAAjvY9 D43GjS7UwAA6l5p

মাঠ আর মাঠের বাইরে, সবখানেই তিনি ছিলেন একজন আদর্শ “জেন্টলম্যান”। বহুবার আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে আউট হয়েছেন। এমনকি হেলমেটে লেগেও এলবিডব্লুর শিকার তিনি হয়েছেন। কখনো একটিবারের জন্যও মেজাজ হারাননি তিনি। গোটা ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি ছিলেন সব ধরণের বিতর্কের ঊর্ধে। সততার প্রশ্নে তিনি ছিলেন প্রশ্নাতীত। আজহারউদ্দিনের পর ভারতের ক্রিকেট যখন ফিক্সিং এর কালো থাবায় আক্রান্ত, তখন তাঁর হাতেই তুলে দেয়া হয়েছিল অধিনায়কের দায়িত্ব। তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। তাঁর দেখানো পথে সফল হয়েছেন অনেক তরুণ ক্রিকেটার। দীনেশ কার্তিক একবার বলেছিলেন, “তিনি যে আমাকে চেনেন, আমার নাম জানেন…এই তো আমার সাত জনমের ভাগ্য”।

তাঁর বাবা ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী। কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী শচীন দেব বর্মণের নাম অনুসারে রাখা হয়েছিল তাঁর নাম। তখন কি তাঁর বাবা জানতেন, এই নামেরই আরো এক কিংবদন্তী জন্ম নিয়েছেন এই মর্ত্যে?          

ধন্যবাদ তোমায়, “শচীন রমেশ টেন্ডুলকার”

৯৭ ডেস্ক

Read Previous

লর্ডসের সেই উড়ন্ত তামিম

Read Next

আমিরকে বিমানে উঠতে দিল না ইংল্যান্ড

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
1
Share