সাব্বির রহমান; আক্ষেপ নাকি প্রত্যাবর্তন?

featured photo1 48
Vinkmag ad

সাব্বির রহমান… ক্যারিয়ারের সূচনালগ্ন থেকেই তাকে বলা হতো “টি-২০ স্পেশালিস্ট”। তার ক্লিন হিটিং এর সক্ষমতা থেকেই হয়ত এই নামে ডাকা হতো তাকে। সেই সক্ষমতার পরিচয়ও তিনি দিয়েছেন বিভিন্নবার। ২০১৬ টি-২০ এশীয়া কাপে শ্রীলংকার সাথে ৫৪ বলে করা ৮০ রানের ইনিংসটি কিংবা ২০১৪ সালে পাকিস্তানের সাথে অপরাজিত ৫১ রানের ইনিংসে বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমীরা খুঁজে পেয়েছিল এক ধরণের নির্ভরতা।

“অবশেষে একজন হার্ড হিটার খুঁজে পাওয়া গেল”- এটা ছিল এক ধরণের স্বস্তি। কারণ টি-২০ তে বাংলাদেশের দরকার ছিল এরকম কজনকে। সাব্বিরকে বলা হচ্ছিল সেইরকম কজনের প্রতিনিধি। কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেল সেই সাব্বির? কেনই বা চেনা সেই সাব্বির রহমান হয়ে গেলেন এতই অচেনা? উত্তরটা খোঁজার একটু চেষ্টা করেছেন রাশিক এহসান প্রান্তিক।

শুরুতেই একটু চোখ বুলিয়ে আসি সাব্বির রহমানের সাম্প্রতিক পারফরমেন্সে। তার খেলা সর্বশেষ ৮ টেস্টের ১৬ ইনিংসে মোট রান ২৭৯, গড় ১৭.৪৩। ফিফটি রয়েছে মাত্র ১টি, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চট্টগ্রামে ৬৬। কতটা দুর্দশাতে আছেন, সেটার প্রমাণ সর্বশেষ ৫ ইনিংস। একবারও পেরুতে পারেননি ৫ রানের গন্ডি।

198893

ওয়ানডেতেও পারফরমেন্স এমনই। সর্বশেষ ১৭ ইনিংসে ১৫.৩৮ গড়ে রান করেছেন ২৭৭। ফিফটি ১টি, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৫। সর্বশেষ ১১ ইনিংসে ফিফটি পাননি একটিও। সেই ঝড়ো ব্যাটিংটাও অনুপস্থিত।
টি-২০তেও বাজে সময় কাটাচ্ছেন এই ডানহাতি। শ্রীলংকার বিরুদ্ধে সেই ৮০ রানের ইনিংসের পর ফিফটি নেই একটিও। সর্বোচ্চ ৪৮, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। মোট রান ৩৩৫, ১৭টি ইনিংস খেলে, গড় ১৯.৭১।

256000

অথচ কত প্রতিশ্রুতি আর সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন তিনি… কঠিন প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে খেলার সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এদেশের লাখো ক্রিকেটপ্রেমীদের। সেই সাব্বির আজ কেমন যেন বিবর্ণ, কেমন জানি অচেনা তার ব্যাট। টানা ব্যর্থতা আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে, মনোসংযোগেও ঘটিয়েছে ব্যাঘাত। শুধু মাঠের পারফরমেন্সই নয়, মাঠের বাইরের কান্ড-কীর্তিও তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে একাধিকবার। তার সর্বশেষ উদাহরণ, দর্শক পেটানোর মতো গর্হিত কাজ তিনি করেছেন। যার ফলে হয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে ৬ মাসের জন্য নিষিদ্ধ। এর আগেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন, সামান্য শাস্তির বিনিময়ে পার পেলেও শিক্ষা নেননি সেই ভুল থেকে।

256979

তার কর্মকাণ্ড দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, লাইমলাইটটার সাথে কেন জানি খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি তিনি। স্টারের তকমা যে শুধু অর্জন করলেই হয়না, সেটাকে যে ধরে রাখতেও হয়, সেই ব্যাপারটি মনে হয় মাঝে মাঝে ভুলে যান তিনি। ভুলে যান তিনি এদেশের হাজার তরুণের রোল-মডেল। অনেক তরুণ ক্রিকেটার তাদের দেখে শেখার অপেক্ষায়। তাদের কাছে আদর্শ না হয়ে বারবার হয়েছেন বিতর্কিত। এই বিতর্কগুলোই তাকে মানসিকভাবে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে, মনোযোগ নষ্ট করেছে। একজন স্টারকে যে মাঠ ও মাঠের বাইরে সবখানে একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড মেনে চলতে হয়, একটা ব্যালেন্স বজায় রেখে চলতে হয়, সেটা ভুলে গেলে চলবে না। সেই জায়গাতেই বরাবরই ফেল করেছেন এই ক্লিন হিটার।

এ তো গেল মাঠের বাইরের কীর্তি। মাঠের ভেতরেও হতাশা জাগানিয়া পারফর্মেন্স তার। উপরে দেয়া সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেটিই প্রমাণ করে। ব্যাটিং পজিশন বদলেও চেষ্টা করেছে টিম ম্যানেজমেন্ট তার ব্যাটে হাসি দেখার জন্য। ফলাফল পাওয়া যায়নি। মাঝে দল থেকে বাদও পড়েছিলেন, আবার ফিরেও এসেছেন। কিন্তু লাভের লাভ হয়নি কিছুই। এখনো তার হয়ে কথা বলছে না ব্যাট। মনোসংযোগেও কমতি চোখে পড়ছে যার প্রমাণ শট সিলেকশনে করা ভুলগুলো। হয়তো টানা ব্যর্থতায় আত্মবিশ্বাসে ঘাটতির ফল এই ভুল্গুলো।

261094

ফিটনেস নিয়ে তার ব্যাপারে কখনো কোন প্রশ্নই ওঠেনি, এখনো উঠছে না। টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে তিনি দারুণ পরিশ্রমী একজন ক্রিকেটার। কিন্তু সমস্যা রয়েছে তার মনোযোগে, তার আত্মবিশ্বাসে। আসলে যেকোন পেশায় সফলতার জন্য সেই পেশার প্রতি সততা আর স্বচ্ছতা- দুটোর খুব বেশি প্রয়োজন। খেলোয়াড়দের জন্য এটি আরো বেশি সত্যি। এই জায়গাতেই মূলত পিছিয়ে পড়েছেন সাব্বির। নিজের খেলার প্রতি নিজেকে যদি আরো সৎ আর নিজের কর্মকাণ্ডের দিকে যদি আরো স্বচ্ছ তিনি থাকতে পারেন, তবে এই বিতর্কগুলো আর তাকে বিরক্ত করতে পারবে না বলেই মনে হয়। এই বিতর্কগুলোই তাকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছে, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ঘটিয়েছে। মাঠের বাইরে তৈরী হওয়া বিতর্কগুলোই যে তার মাঠের পারফরমেন্সকে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে, সেটি সহজেই অনুমেয়।

এই বিতর্কগুলোকে পেছনে ফেলে সাব্বির রহমানকে এগিয়ে আসতে হবে। এখনো দলে রয়েছেন তিনি, সময় তাই ফুরিয়ে যায়নি বলাই যায়। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে শুধরে নিতে পারলেই তিনি আবার সেই পুরোনো সাব্বির হয়ে ফিরে আসতে পারবেন। আর তিনি সেই পুনরায় পুরোনো নির্ভীক সাব্বির হয়ে উঠতে পারলে, এদেশের লাখো ক্রিকেটভক্তরাই হবে সবচেয়ে বেশি খুশি। আর যদি তিনি এটি করতে না পারেন, তবে এদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তিনি থাকবেন একটা আক্ষেপের সমার্থক হয়েই, এদেশের ক্রিকেট তাকে মনে রাখবে এমন একজন হিসেবে যে কিনা এক সময় সবাইকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু নিজেই বেখেয়ালে নিজেকে হারিয়েছে…

৯৭ ডেস্ক

Read Previous

হাথুরুসিংহের কথায় আংশিক একমত মাহমুদউল্লাহ

Read Next

প্রাইম দোলেশ্বরের টানা তৃতীয় জয়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
0
Share