পঞ্চপাণ্ডবের পারফর্মেন্স – তরুণরা প্রশ্নবিদ্ধ

featured photo1 77

গত ২ বছর ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সাফল্যমন্ডিত দুটি বছর। সাফল্য আর ব্যর্থতার হিসেব যদি করা হয়, নির্দ্বিধায় সাফল্যের পাল্লাই হবে ভারী। পরিণত ক্রিকেটের ছাপ ছিল স্পষ্ট। ব্যক্তিগত সাফল্যের রূপান্তর হয়েছে দলীয় সাফল্যে। মিলেছে নানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তবে এই দুটি বছর এদেশের ক্রিকেট ভক্তদের যেমন আনন্দ দিয়েছে, তেমনি জন্ম দিয়েছে কিছু প্রশ্নের। সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন রাশিক এহসান প্রান্তিক

চলুন একটু ঘুরে আসি গত দুই বছরের বাংলাদেশ দলের পারফর্মেন্সে। ছিল ভারত, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা আর দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ। ২০১৬ আর ২০১৭ মিলিয়ে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে ৬ সিরিজ মিলিয়ে মোট ১১টি। দেশের মাটিতে খেলেছে ৪টি টেস্ট। বাকিগুলো দেশের বাইরে। জয় ৩টি, পরাজয় ৮টি। অন্যান্য বছরের তুলনায় পরিসংখ্যানটা খুব একটা খারাপ বলা যায় না। দেশের মাটিতে টেস্ট জেতাটা প্রায় সহজলভ্য হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির স্পষ্ট ছাপ রেখেছে বাংলাদেশ এই দুই বছরে।  ওয়ানডে খেলেছে  ১৯টি। জয় ৬টি, পরাজয়  ১১টি, ড্র ২টি। আর টি-২০ খেলেছে ২৩টি। ৮টি জয় আর পরাজয় ১৪টি। বাকি ম্যাচটিতে কোন ফলাফল হয়নি।

Bangladesh 03
সিনিয়রদের পারফরমেন্সে হাসছে দল

এখন আসি ব্যক্তিগত পারফরমেন্সের দিকে। সিনিয়র খেলোয়াড়দের, বিশেষ করে “পঞ্চপান্ডব” এর ব্যক্তিগত পারফর্মেন্স ছিল এককথায় অসাধারণ। এই পঞ্চপান্ডবকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছুই নেই। গত দুই বছরের প্রায় সবগুলো জয়ই এসেছে এই পঞ্চপান্ডবের হাত ধরেই। ২০১৬ সালে তামিম ইকবাল খেলেছেন ২টি টেস্ট। ৫৭.৭৫ গড়ে রান ২৩১। সেবছর সেঞ্চুরী, হাফসেঞ্চুরী পেয়েছেন ১টি করে। পরের বছর খেলেছেন ৮টি টেস্ট। ৩৩.৫৬ গড়ে রান ৫৩৭, সেঞ্চুরী নেই, হাফ সেঞ্চুরী পেয়েছেন ৫টি। ওয়ানডেতে তামিম ছিলেন বেশি সপ্রতিভ গত দুই বছরে। ২০১৬ তে ৯ টি ওয়ানডে খেলে রান করেছেন ৪০৭, গড় ৪৫.২২। স্ট্রাইক রেট ছিল ৭৩.৭৩। ২০১৭তে তামিম রান করেছেন ৬৪৬, গড় ৬৪.৬০, স্ট্রাইক রেট ৮৩.১৪, এক কথায় অসাধারণ। সেঞ্চুরী পেয়েছেন ২টি, হাফ সেঞ্চুরী ৪টি। টি-২০তে ২০১৬ সালে ৪০.৮৯ গড় আর ১৩৫.৭৯ স্ট্রাইক রেটে রান করেছিলেন ৩৬৮। সে বছরের টি-২০ বিশ্বকাপে করেছিলেন অপরাজিত সেঞ্চুরী যা বাংলাদেশের হয়ে টি-২০তে প্রথম। আর ২০১৭ সালে সেভাবে হাসেনি তামিমের ব্যাট ক্রিকেটের এই সংস্করণে।বিগতদুইবছর পুরো ক্রিকেট বিশ্বই ছিল তামিম বন্দনায় মুখরিত। গত দুই বছরে ধারাবাহিক যদি কাউকে বলা যায়, তবে সেটি এই তামিম ইকবাল খানই। তামিম মানেই যেন ছিল রান। বলাই যায়, বাংলাদেশের গত দুই বছরের উত্থানে তামিমের অবদান অনেক।

এরপরই আছেন মুশফিকুর রহিম। ২০১৬ সালটা সাদা বলের ক্রিকেটে তেমন ভাল না কাটলেও পরের বছরে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটিং এর অন্যতম ভরসার নাম হয়ে। ২০১৭ তে ৮ ম্যাচের ১৬ ইনিংসে রান করেছেন ৭৬৬, গড় ৫৪.৭১, সেঞ্চুরী ২টি, হাফ সেঞ্চুরী ৩টি। ছিল নিউজিল্যান্ড আর ভারতের মাটিতে অসাধারণ দুইটি সেঞ্চুরী। ২০১৬ সালে ওয়ানডেতেও তার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। ১টি হাফ সেঞ্চুরী ছিল, রান ছিল ১৯৮। পরের বছর ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ছিলেন দুর্দান্ত। ১৩ ইনিংসে রান করেছিলেন ৪৫৮, গড় ছিল ৪৫.৮০। স্ট্রাইক রেট ৮২.৩৭। সেঞ্চুরী পেয়েছিলেন ১টি, হাফ সেঞ্চুরী ৪টি। টি-২০ তে গত দুই বছরে মুশফিকের পারফর্মেন্স তেমন ভাল ছিল না। আর টেস্ট অধিনায়কত্ব নিয়ে কিছু সমস্যায় হয়তো পড়েছিলেন তিনি গত বছরে যার সমাধান হয়েছে অধিনায়কত্ব থেকে অব্যাহতির মাধ্যমে, বছরের শেষদিকে এসে। কিন্তু বরাবরের মতই ব্যাটিং নিয়ে কোন প্রশ্নই ছিল না গত দুই বছরে। বরং তার খেলা দেখে মনে হয়েছে, আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত একজন হয়েছেন তিনি। তার শক্তির জায়গা যেটি ‘টেকনিক’ তা যেন আরো কার্যকর হয়েছে। ভারত আর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে করা সেঞ্চুরী দুটিই সেটির জ্বলন্ত উদাহরণ।

26756326 429368094149293 5099509856541299698 o
ছবি: সংগৃহীত

সাকিব-আল-হাসানকে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। ব্যাটে বলে ছিলেন সমান কার্যকর সব সময়ের মতই। বছরের শেষদিকে এসে একবার বিতর্কে জড়িয়েছিলেন বিসিবির কাছে ছুটি নিয়ে। ২০১৬ সালে টেস্টে সাকিবের ব্যাট হাতে সময় তেমন ভাল যায়নি। ২০১৭ সালে টেস্টে সাকিবের ব্যাট হেসেছে নিয়মিতই। রান করেছেন ৬৬৫, ১৪টি ইনিংস খেলে। শতক ছিল ২টি, যার মধ্যে ছিল নিউজিল্যান্ডে করা ডাবল সেঞ্চুরী যা বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান। হাফ সেঞ্চুরীও ছিল ৩টি। গড় ছিল ৪৭.৫০।এই পারফর্মেন্স তাকে আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট দলে জায়গা করে দেয়। বল হাতে ২০১৬ সালে টেস্টে উইকেট নিয়েছেন ১২টি।২০১৭ সালে তার উইকেট সংখ্যা ২৯টি। ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়েছেন ১ বার, ১ বার পেয়েছেন ম্যাচে ১০উইকেট। গত দুই বছরে বাংলাদেশের সাফল্যে ব্যাটে বলে ছিলেন দুর্দান্ত। ২০১৬ সালে সাকিবের ওয়ানডেতে রান ২৫২, রয়েছে দুইটি হাফ সেঞ্চুরী। গড় ছিল ২৮ আর স্ট্রাইক রেট ৯১.৯৭। ২০১৭ সালে সাকিবের রান ৪৩০, গড় ৩৫.৪৩। সেঞ্চুরী ১টি, বিখ্যাত সেই কার্ডিফের নিউজিল্যান্ড বধে। হাফ সেঞ্চুরী ৩টি। আর স্ট্রাইক রেট ৮২.৫৩। বল হাতে ২০১৬ সালে তিনি ওয়ানডেতে উইকেট নিয়েছেন ১৪টি, ২০১৭ সালে ৬টি। টি-২০তে ২০১৬ সালে রান করেছেন ২৬০, উইকেট নিয়েছেন ২০টি। ২০১৭তে রানের সংখ্যা ১২০, উইকেট ৮টি। বছরের শেষদিকে এসে পেয়েছেন টেস্টের অধিনায়কত্বের ভার। ব্যাট-বলে যেভাবে তিনি হয়েছেন ভরসার নাম, অধিনায়কত্বেও তেমন ভরসা জোগাবেন দলকে- তার কাছে সবার প্রত্যাশাটা তেমনই।

ব্যাট হাতে গত দুই বছর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সাদা পোশাকে তেমন ভাল সময় না গেলেও রঙ্গিন পোশাকে তিনি ছিলেন ভাল ফর্মে। লাল বলের ক্রিকেটে বাজে ফর্ম দলের বাইরে ছিটকে দিলেও পরে টেস্ট দলে ফিরেছেন বছরের শেষ দিকে। তার কদিন পরই পেয়েছেন টেস্ট দলের সহ-অধিনায়কত্ব। পড়তি ফর্মের কারণে বাদ পড়েছিলেন। সহ-অধিনায়কত্বটা একপ্রকার চ্যালেঞ্জ হয়েই এসেছে তার কাছে। সবার চোখ থাকবে তার উপরে। ২০১৬ সালে ওয়ানডেতে দুই হাফ সেঞ্চুরীতে রান করেছেন ২২৯। ২০১৭ সালে ৫১.৪৩ গড়ে রান করেছেন ৩৬০ যার ভেতরে রয়েছে সাকিবের সাথে জুটিতে করা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অসাধারণ সেঞ্চুরী। সে বছর তার স্ট্রাইক রেট ছিল ৯১.৬০। টি-২০তে ২০১৬ সালে তিনি রান করেছেন ২৭৫, স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩৯.৫৯। ২০১৭ সালে তান করেছেন ১৫১, গড় ২৫.১৭। আর স্ট্রাইক রেট ১১৫.২৭। বল হাতে গত দুই বছরে তাকে তেমন নিয়মিত দেখা যায়নি, টি-২০তে উইকেট পেয়েছেন দুই বছর মিলিয়ে ৬টি।

BD Team 01
দলকে নেতৃত্ব দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন ক্যাপ্টেন মাশরাফি

গত দুই বছরে মাশরাফি ছিলেন সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফলতম বোলার। ওয়ানডেতে ২০১৬ সালে ২৪.৪০ গড়ে উইকেট সংখ্যা ১৫টি, ২০১৭ সালে পেয়েছেন ১৩ উইকেট। আর টি-২০ তে ২০১৬ সালে তুলে নিয়েছেন ১০ উইকেট, ২০১৭ তে ৪টি। দুই ধরণের ক্রিকেটেই তার ইকোনমি রেটটাও ছিল অসাধারণ। দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সঠিক সময়ে একদম সামনে থেকে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে তার অসাধারণ নেতৃত্বেই বাংলাদেশ উঠেছিল সেমিফাইনালে। বিপিএলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আবার নিজের মুকুটে যোগ করেছেন বিপিএলের শিরোপা।গত বছরে অবসর নিয়েছেন টি-২০ থেকে। দেশের ক্রিকেটের এই রোল মডেল আর কতদিন এই শারীরিক ধাক্কা নিতে পারবেন, এই প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়। যদিও মাঠের খেলায় এখনো অনেক তরুণের চেয়ে এগিয়ে আমাদের সবার ভালবাসার “নড়াইল এক্সপ্রেস”।

আরও পড়ুন: পরিণত তামিম ভয়ঙ্কর 

গত দুই বছরে বাংলাদেশের প্রতিটি জয়ই এসেছে বলতে গেলে পঞ্চপান্ডবের কাঁধে ভর করেই। একদিকে এটি যেমন আশার ব্যাপার, ঠিক অন্যভাবে ভাবতে গেলে এটি প্রবল আশংকারও ব্যাপার। সিনিয়ররা তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে যেটা বিশ্বের সকল দলেরই কাছেই একটি দারুণ ব্যাপার। কিন্তু আমাদের এই কথা ভুলে গেলে চলবে না যে তাদেরও বয়স বাড়ছে। তাদের অনুপস্থিতিতে দলের চেহারা, পারফর্মেন্স কেমন হবে সেটি নিয়ে ভাবার সময় এখনই। যাদের সেই সিনিয়রদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব নেয়ার মত ভাবা হচ্ছিল, তাদের পারফর্মেন্স আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আর মাত্র ক’বছর পরই হয়তো আমরা সিনিয়রদের দলে পাবো না। বর্তমানে যারা জুনিয়র হিসেবে দলে খেলছেন, তারা সিনিয়রদের জায়গা নিতে পারবেন কিনা, সেই প্রশ্ন জাগছে তাদের সাম্প্রতিক পারফর্মেন্স দেখে।

264425
সৌম্যকে হারিয়ে খুঁজছেন নিজেকে

সৌম্য সরকার যাকে ভাবা হচ্ছিল তামিম ইকবালের যোগ্য সঙ্গী এবং বিকল্প, সে আজ বাজে ফর্মের কারণে দলের বাইরে। গত বছর ৭টি টেস্ট খেলে রান করেছেন ৪৫১, গড় ৩২.২১। ওয়ানডেতেই সবচেয়ে করুণ তার অবস্থা।গত দুই বছরে ১৫ ইনিংসে তার রান মোটে ২৭৫। গড় মাত্র ১৮.৩৩। সেই অনুযায়ী গত বছরে টি-২০তে কিছুটা হেসেছে তার ব্যাট। ২০১৬ সালে ১৬টি টি-২০ খেলে মাত্র ১৫.৯৪ গড়ে রান করেছেন ২৫৫। স্ট্রাইক রেট ছিল ১০৬.৬৯। গত বছরে ৭ ইনিংসে করেছেন ২৩৫ রান, হাফ সেঞ্চুরীও নেই কোন। স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫৬.৬৭ যা প্রমাণ করে ইনিংসের শুরুটা ভালই করছেন তিনি কিন্তু ইনিংসকে লম্বা করতে পারছেন না। রান পাননি কদিন আগে শেষ হওয়া বিপিএলেও। এমনকি ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটেও বেশ বাজে সময়ই কাটাচ্ছেন এই বাঁহাতি। এই দুঃসময় দ্রুত না কাটিয়ে উঠতে পারলে ঘোর বিপদেই পড়বেন তিনি।

featuhoto2
ছবি: ক্রিকেট৯৭

আরেকদিকে বলা যায় সাব্বির রহমানের কথা। মারকুটে ব্যাটিং এর প্রতিভা নিয়ে দলে এসেছিলেন, অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল তার খেলাতে। সেই সাব্বিরের ব্যাটেও রান নেই। অথচ তার কাছে প্রত্যাশা ছিল অনেক। মিডিল অর্ডারে দ্রুত রান তুলে দলে অবদান রাখার কথা ছিল তার। অথচ তিনি কিনা দর্শক পিটিয়ে এখন ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষিদ্ধ। মাঠ ও মাঠের বাইরে বিগত ২ বছরে একাধিকবার তিনি জন্ম দিয়েছেন নানা বিতর্কের। গত বছর ৮ টেস্টের ১৬ ইনিংসে রান করেছেন ৩৮২, গড় ছিল ২৫.৪৭। ২০১৭ সালে১৪ ওয়ানডের ১৩ ইনিংসে রান করেছেন মাত্র ২৮৯। গড় মাত্র ২২.২৩। আর টি-২০ তে অবস্থা আরো ভয়াবহ। ৭ ম্যাচে ২০.১৪ গড়ে রান করেছেন ১৪১। ব্যাটিং অর্ডারের বিভিন্ন পজিশনে খেলিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে তাকে দিয়ে। লাভ হয়নি কোথাও তেমন। এমনকি টেস্টে অস্ট্রেলিয়া সিরিজে তাকে খেলানো হয়েছে টপ-অর্ডারে, ফিরেছেন সেই খালি হাতেই। জাতীয় দল থেকে এখনো বাদ পড়েননি তিনি। কিন্তু দ্রুত রানে ফিরতে না পারলে বেশিদিন দলে থাকতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না।

mustafiz 2
ছবি: সংগৃহীত

আরও পড়ুন: যেমন হল ডিপিএলে দলগুলো 

ইনজুরিতে পড়ার পর থেকে মুস্তাফিজ যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন। লাইন লেংথ হারিয়ে তিনি যেন দিশেহারা। সেই “ফিজ ম্যাজিক” যেন হঠাৎ করেই উধাও। অথচ কত সম্ভাবনা নিয়ে দলে এসেছিলেন তিনি। সারা ক্রিকেট বিশ্ব শুনেছিল তার আগমনী বার্তা। গত বছর টেস্টে ৩৬.৩৮ গড়ে উইকেট পেয়েছেন ১৬টি। একদিনের ক্রিকেটে গত বছরে ১১টি ম্যাচে ৩২.৫৭ গড়ে উইকেট পেয়েছেন ১৪টি। ইকোনমি রেট ছিল ৫.৪৮। যে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে তিনি এসেছিলেন, গত বছরে তা কেমন যেন মিইয়ে গিয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুর মুস্তাফিজ আর এখনকার মুস্তাফিজের মাঝে পার্থক্য চোখে পড়ার মত। মাঝে মাঝে পুরোনো মুস্তাফিজের ঝলক দেখা গেলেও তা নিয়মিত নয়। ২০১৬ সালে টি-২০ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পেয়েছিলেন ক্যারিয়ার সেরা ৫/২২। সে বছর টি-২০ তে ভাল সময় কাটালেও পরের বছর পারফর্মেন্স তার কাছ থেকে আশানরূপ নয়। তার বোলিং এ হঠাৎ করেই কেন যেন আত্মবিশ্বাসের কমতি চোখে পড়ছে। যদিও কোচিং প্যানেল বলছেন, নেটে যথেষ্ট ঘাম ঝরাচ্ছেন এই বাঁহাতি দুঃসময়কে পেছনে ফেলতে। উন্নতিও করছেন বলে আশ্বস্ত করেছেন টিম ম্যানেজমেন্ট। সবারই প্রত্যাশা, খুব দ্রুতই আগের মুস্তাফিজকে দেখা যাবে বল হাতে। সেটি না ঘটলে, ভবিষ্যতে কি হতে পারে, সেটি সবারই অজানা। ত্রিদেশীয় সিরিজে অবশ্য দেখা মিলেছে সেই পুরাতন মুস্তাফিজের।

তারপর বলা যায় তাসকিন আহমেদের কথা। অভিষেকেই ভারতের বিপক্ষে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। বাংলাদেশী বোলারদের ‘গতি’ নামক যে অস্ত্রের অভাব ছিল, সেটিই ছিল তার অন্যতম হাতিয়ার। অভিষেকের অনেক আগে থেকেই তাকে ঘিরে ছিল অনেক প্রত্যাশা। সম্ভাবনাও কম ছিল না তার মাঝে। কিন্তু ছন্দপতন ঘটেছে তারও। গত বছরে শ্রীলংকার বিপক্ষে এক হ্যাটট্রিক ছাড়া বলার মত কোন পারফর্মেন্স নেই তার। এই বছরের শুরুতে তাই দল থেকেও ছিটকে গেছেন সদ্য বিবাহিত এই ডানহাতি ফাস্ট বোলার। ২০১৭ সালে খেলেছেন ৫টি টেস্ট, উইকেট মাত্র ৭টি। ওয়ানডেতে ২০১৬ সালটা মোটামুটি ভাল গেলেও ২০১৭ তাকে শুধু হতাশই করেছে। ২০১৭তে ৯ ম্যাচ খেলে উইকেট পেয়েছেন ১০টি, ইকোনমি ৬.৬০। টি-২০তে গত বছর খেলেছেন ৪টি ম্যাচ, উইকেট মাত্র ১টি, ইকোনমি ১১.১৫। শেষমেশ তাই বাদই পড়েছেন দল থেকে। শুধু গতি দিয়ে যে ভাল বোলিং হয়না, তা তার ইকোনমি রেটটাই বলে দেয়। খুব দ্রুত এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে আবার তাকে কবে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখা যাবে, তা অনিশ্চিত।

সুতরাং একথা বলাই যায়, যে তরুণদের দলের হাল ধরার কথা ছিল, তারা নিজেরা আজ নিজেদের হারিয়ে খুঁজছেন। অথচ প্রত্যেকেই দলে এসেছিলেন অমিত সম্ভাবনা নিয়ে, পারফর্মও করেছেন কিছুদিন। কিন্তু তারপরই হঠাৎ ছন্দপতন ঘটেছে তাদের। তাই এই প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক যে পঞ্চপান্ডবের অনুপস্থিতিতেএদের হাতে পড়লে কেমন করবে দল। কেন এই তরুণদের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তা জাগাটাই স্বাভাবিক। আজ থেকে ৬/৭ বছর পর যখন এই পঞ্চপান্ডবকে আর দলে পাওয়া যাবে না, তখন দলের দায়িত্ব নেয়ার মত কোন ক্রিকেটার কি আমরা তৈরি করতে পারছি? আমাদের জাতীয় দলের পাইপলাইনে সেরকম ক্রিকেটার কি প্রস্তুত হচ্ছে? নাকি তখন ধুঁকতে হবে আবার?

শুনতে কঠিন মনে হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, আসলেই যদি এই পঞ্চপান্ডবের বিকল্প খুঁজে বের করা সম্ভব না হয়, তাহলে বেশ কঠিন সময়ই অপেক্ষা করছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য। এই তরুণদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে খুব দ্রুত। আর ভবিষত্যের কথা ভেবে সেরকম মানসম্মত খেলোয়াড় তৈরীর প্রক্রিয়া শুরু করার সময় এখনই। একদিনে কোন ক্রিকেটার তৈরী হবে না, সুতরাং সময় থাকতেই সেই চিন্তা করা উচিত বলেই মনে হয়। ঘরোয়া আসরে ভাল পারফর্ম করা তরুণদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য তৈরী করে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তাদের ভিত্তিকে আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে তৎপর হওয়া উচিত। ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিযোগিতার মানবাড়িয়ে তাদের দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে নিতে না পারলে সামনের অদূর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে বেশ কঠিন পরীক্ষাই দিতে হবে বাংলাদেশকে।

৯৭ প্রতিবেদক

Read Previous

শাইনপুকুর ছাড়তে পারেন মাশরাফি!

Read Next

হাথুরু নয়, নিজেদের নিয়েই ভাবছেন সুজন

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Total
0
Share