তাসকিনের ‘মিশন ১৫০’, যেভাবে চলছে কাজ

তাসকিন আহমেদ

মানসিকতা বদলে স্কিল ও ফিটনেস নিয়ে তাসকিন আহমেদ সাম্প্রতিক সময়ে যা করেছেন তা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের কোন পেসার এর আগে করেননি। লকডাউনে পুরো পৃথিবী যখন স্থবির, তাসকিন তখন কঠোর পরিশ্রমে তিলে তিলে নিজেকে গড়ার মিশনে নেমেছেন। দুর্দান্ত শুরুর পরও ক্যারিয়ারের মাঝপথে হারিয়ে যেতে বসা এই গতি তারকা জানান দিয়েছেন দাপটের সাথে ফিরতে তিনি কতটা মরিয়া। তার কিছুটা হলেও ছাপ রাখতে পেরেছেন বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে।

দিন কয়েক পর শুরু হচ্ছে বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ। তার আগে তাসকিনকে দেখা যাচ্ছে তার শুরু দিকের কোচ মাহবুব আলি জাকির সাথে নিয়মিত কাজ করতে। তাদের এই কাজ বড় এক লক্ষ্যেরই অংশ। যার শুরুটা হয়েছে গত জানুয়ারি থেকে, ২৫ বছর বয়সী ডানহাতি এই পেসারের গতি স্পিডমিটারে ১৫০ ছোঁয়ানোই মূল লক্ষ্য। এই কার্যক্রম চলবে আরও এক বছর।

তাসকিনের এই লক্ষ্য অর্জনে বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের কোচ জাকি ছাড়াও কাজ করছেন বিদেশি কোচ, ট্রেইনাররাও। ২০১৮ সালে জাতীয় দলের জার্সিতে সর্বশেষে ম্যাচ খেলা এই গতি তারকা বদলে যাওয়া মানসিকতায় যে উন্নতি করছেন তা নজরে এসেছে জাতীয় দলের কোচ, নির্বাচক এমনকি বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনেরও।

‘ক্রিকেট৯৭’ এর সাথে একান্ত আলাপে কোচ মাহবুব আলি জাকি পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলেন, ‘একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে গত জানুয়ারি থেকে আমাদের কাজ শুরু হয়েছে। আসলে দীর্ঘদিন সে জাতীয় দলের বাইরে ছিল, বিশেষ করে শেষ তিন বছর অনেকটা হারিয়ে যাওয়ার মতই। উমরাহ (হজ্ব) করে আসার পর সে কিছু একটা অনুধাবন করে। সে একটা পরিকল্পনা হাতে নেয় আর আমার সাথে সেটা শেয়ার করে।’

‘আমি তাকে বলেছি যে এটা করতে হলে আমাদের একটা টিম তৈরি করতে হবে। এই পরিকল্পনার জন্য বডি ট্রান্সফরমেশন করতে হবে, মাশল নিয়ে কাজ করতে হবে। আর এ জন্য একজন ট্রেইনার লাগবে যে সবসময় দিক নির্দেশনা দিবে। কারণ লক্ষ্য ঠিক করলেই তো হবে না, এর জন্য যে পরিশ্রম সেই লোড নেওয়ার সামর্থ্য থাকতে হবে। তাসকিন সেটা মাথায় নিয়েই রাজি হয়। এরপর আমরা একটা ডিজাইন তৈরি করি।’

‘মূল লক্ষ্য হল সে যেন আবার জাতীয় দলে নিয়মিত হতে পারে এবং গতিটা যেন আরও বাড়াতে পারে। ও যখন শুরু করে তখন টানা ১৪০-১৪২ ছিল ওর গতি। ২০১৫ বিশ্বকাপে ১৪৮ ছুঁয়েছিল একবার। এখন নিয়মিত যেন ১৫০ এর আশেপাশে কিংবা ১৫০ গতিতে বল করতে পারে সে লক্ষ্যে এগোচ্ছি। শুধু গতি না আরও কিছু বিষয়ও আছে আমাদের এই প্ল্যানে, কিন্তু সেটা পরের ধাপে। আপাতত তাকে জাতীয় দলের জন্য সেরা একটা শেইপে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। দুই বছরের একটা টার্গেট সেট করা হয়েছে যার এক বছর শেষের পথে।’

তাসকিন যেভাবে উন্নতি করছেন তাতে সুস্থ থাকলে তাদের পরিকল্পনা সফল হবে বলে বিশ্বাস মাহবুব আলি জাকির, ‘দেখেন এই পুরো প্ল্যানের অধীনে ও যে পরিশ্রম করেছে আমার মনে হয়না বাংলাদেশে আর কোন পেসার এতটা পরিশ্রম করেছে এর আগে। ও নিজে এতটা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নেমেছে যে লক্ষ্য পূরণ করতেই হবে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ১৫০ গতিতে বল করার মত পেসার আছে একাধিক, আমাদের দেশে থাকবে না কেন?’

‘ও যেভাবে এগোচ্ছে সবার দোয়ায় আশা করি একটা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। তবে সে জন্য ওকে তো সুস্থ থাকতে হবে। ওর জন্য যেসব ট্রেনিং রাখা হয়েছে তা খুব সহজ না, এটা টেনে নিতে হবে ওকেই। কেবল ও সুস্থ থাকলেই সেটা সম্ভব।’

এই প্ল্যানে কাজ করা বিদেশির অবদানও তুলে ধরেন বিসিবির এই কোচ, বিভিন্ন ট্রেনিংয়ে গিয়ে যাদের সাথে পরিচয় হয় তার। বিদেশি এই কোচ, ট্রেইনাররা অবশ্য এর আগেও তাসকিনের সাথে কাজ করেছেন অবৈধ বোলিং অ্যাকশন সন্দেহে নিষিদ্ধ হওয়ার সময়টায়।

মাহবুব আলি জাকি এ প্রসঙ্গে যোগ করেন, ‘আমার সাথে এখানে আরও কয়েকজন আছে যারা ওকে নিয়ে কাজ করছি। দেশিদের সাথে বিদেশে আমার কিছু বন্ধু আছে ট্রেইনার, কোচ তাদের সম্মিলিত একটা প্রচেষ্টা বলা যায়। এ ধরনের একটা লক্ষ্যে কাজ করার জন্য আমাদের দেশে খুব কম লোক আছে। আমি বিভিন্ন দেশে কোচিং, ট্রেনিং নিয়েছি দেখা যাচ্ছে ওখানে আমার যারা পরিচিত আছে তাদেরও আমি তাসকিনের এই প্ল্যানে যোগ করেছি।’

‘তারা নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। অবৈধ বোলিং অ্যাকশন সন্দেহে যখন নিষিদ্ধ হয় তখনও ওরা তাসকিনের সাথে কাজ করেছে। তবে পুরো বিষয়টা আমি নিজে তদারকি করছি। ওর দৈনন্দিন রুটিনই আমাকে মনিটর করতে হয়। লকডাউনে দেখেছেন কতটা পরিশ্রম করেছে সে।’

বিভিন্ন টুর্নামেন্ট ও সিরিজের কারণে দুই বছরের প্ল্যানে তাসকিনের সাথে টানা কাজ করা সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে বিরতি পড়লেও দলগুলোর কোচদের নির্দেশনা দিয়ে দেন মাহবুব আলি জাকি।

তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে দুটো টুর্নামেন্ট চলে এসেছে। একটা শেষ হল (বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ), আর একটা সামনে (বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ)। ফলে নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটলেও আমি তার দলের কোচদের বলে দিয়েছি ওর রুটিন কাজগুলো যেন বুঝে নেয়। এর বাইরে আমার সাথে যোগাযোগ তো থাকছেই।’

২০১৩ সালে চট্টগ্রাম ভাইকিংসের হয়ে নজর কাড়া ১৭ বছরের কিশোর তাসকিনকে ঘষা মাজা করে জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত করতে বিসিবি বেছে নেয় মাহবুব আলি জাকিকে। তার দেওয়া টোটকাতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় গতির ঝড় তুলতে পারা এই পেসারের। দুর্দান্ত শুরুর পর মাঝে ছন্দ হারিয়েছেন, বাদ পড়েছেন, চোট পিছিয়ে দিয়েছে আরও কিছুটা। সবমিলিয়ে মুদ্রার এপিট ওপিঠ ভালোভাবেই জানা হয়েছে তাসকিনের।

বদলে যাওয়া তাসকিন ও কিশোর তাসকিনের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরতে গিয়ে মাহবুব আলি জাকি যোগ করেন, ‘তখন বয়স কম ছিল, অল্প বয়সে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া, বিজ্ঞাপনে অভিনয়, সবমিলিয়ে চারদিকের চাকচিক্যতায় মজে গিয়েছিল। এরপর যখন বাদ পড়লো, আস্তে আস্তে জাতীয় দল থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল।’

‘তখন বুঝানো শুরু করলাম পারফরম্যান্স খারাপ হলে, জাতীয় দলে সুযোগ না পেলে রাস্তার বিলবোর্ড থেকে ছবি সরে যাবে, মূল্য কমে যাবে। শুরুতে অনুধাবন না করলেও পরে নিজেই বুঝতে পেরেছে। এখনতো দেখতেই পাচ্ছেন কতটা বদলে গেছে মানসিকতা। পুরো নজর ক্রিকেটে, বদ্ধ পরিকর। তার লক্ষ্য এখন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গতির বোলার হওয়া।’

এদিকে শুধু তাসকিন নয় জাতীয় দলের আরেক তারকা পেসার মুস্তাফিজও নিয়মিত কাজ করেন মাহবুব আলি জাকির সাথে। মূলত বয়সভিত্তিকে তার কাছেই স্কিলের কাজ করেছেন বলে এখনো সমস্যায় পড়লে দ্রুত সমাধানে তার কাছেই ছুটে আসেন তাসকিন, মুস্তাফিজরা।

এ প্রসঙ্গে বিসিবির পেস বোলিং কোচ জাকি বলেন, ‘মুস্তাফিজ, তাসকিন এরাতো আমার অধীনেই বড় হয়েছে। বয়সভিত্তিকে ওদের পেয়েছি আমি। এখনও কোন সমস্যা হলে আমার কাছে আসে। আসলে বিদেশি কোচদের সাথে সেভাবে সমস্যা খুলে বলতে পারেনা। তারা ভাবে আমিতো আগে থেকেই কাজ করেছি তাদের সাথে, তাই আমাকে বললে দ্রুত সমাধান বের করা যাবে।’

‘আসলে ওরা আমার উপর বিশ্বাস রাখে এটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার। মুস্তাফিজ আইপিএল থেকে ফিরে এসেও সমস্যা নিয়ে আমার সাথে কাজ করেছে। এখনকার আধুনিক ক্রিকেট তো বদলে গেছে। তাদের সবসময় এটা বোঝাই যে মানসিকতা ঠিক রেখে স্কিলে জোর দিয়ে পরিকল্পনা মোতাবেক যেন কাজ করে।’

নাজমুল হাসান তারেক

Read Previous

গতকাল দেশে ফেরা তামিমের করোনা টেস্ট আগামীকাল

Read Next

মিনিস্টার গ্রুপ রাজশাহীর অধিনায়ক শান্ত

Total
6
Share
error: Content is protected !!